বৃহস্পতিবার, ১৩ আগস্ট ২০২৬

ভারতে পালানোর সময় পুলিশের জালে গ্রেপ্তার আতঙ্কের নায়ক ডেভিড ইমন

1 সপ্তাহ আগে | আপডেট: 6 দিন আগে | সারাদেশ

Administrator

ভারতে পালানোর সময় পুলিশের জালে গ্রেপ্তার আতঙ্কের নায়ক ডেভিড ইমন

দেশে ফেরার চার দিনের মধ্যেই পলাতক সন্ত্রাসী ডেভিড ইমন পুলিশের হাতে ধরা পড়েন, যিনি দেড় বছর ধরে চট্টগ্রামে খুন-চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসের মাধ্যমে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছিলেন।

সর্বশেষ সব খবরের জন্য দৈনিক খবর সংযোগের গুগল নিউজ চ্যানেল অনুসরণ করুন।

চট্টগ্রাম শহরকে গত দেড় বছর ধরে সন্ত্রাসে নিমজ্জিত রেখেছেন ডেভিড ইমন নামে এক অপরাধী, যিনি আসলে মোবারক হোসেন। চাঁদাবাজি থেকে শুরু করে খুন, ব্যবসায়ীর বাড়িতে নিরীহ গোলাগুলি এবং কলোনিতে সংঘটিত নির্মমতার ঘটনা—সবকিছুই তাঁর দাপুটে কর্মকাণ্ডের তালিকায় আছে। তাঁর হুমকিমূলক ভিডিও বার্তা ভাইরাল হয়েছে বারবার। মানুষ মনে রেখেছে তাঁর বিখ্যাত বাণী—'একটি খুন হোক বা দশটি, শাস্তি একই থাকবে', এবং 'তোর পুরো শরীরে এমন করে গুলি করব, পরিবার খোঁজেই পাবে না'। একজন সাধারণ গ্রামের যুবক এমনভাবে ধীরে ধীরে হয়ে উঠেছেন দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী, যার নাম শুনলেই চট্টগ্রামের বণিকরা ভয়ে কাঁপতেন। তাঁর হুমকিতেই অগণিত ব্যবসায়ীর দোকান, বাড়ি এবং নির্মাণাধীন ভবন ভেঙে দেওয়া হয়েছে নির্দিষ্ট ঘোষণার পর।

যদিও তিনি দুবাইতে বসে বহুদিন অপরাধ পরিচালনা করেছেন, গত কয়েকদিনে ভারতে প্রবেশ করেন এবং সেখান থেকে দেশে ফেরার সিদ্ধান্ত নেন। দেশে এসেছেন মাত্র চার দিন আগে। এই তথ্য পুলিশের কাছে পৌঁছালে তারা তাঁর গ্রেপ্তারির জন্য প্রস্তুতি শুরু করে। পুলিশের অপারেশনের খবর পেয়ে তিনি আবার ভারতে ফিরে যাওয়ার চেষ্টা করতে থাকেন। কিন্তু যশোরের কোতোয়ালি থানার ঝুমঝুমপুর এলাকায় পুলিশ তাঁর পথ আগলে ধরেন। গত মঙ্গলবার রাতে তাঁকে তিনজন সহযোগীসহ গ্রেপ্তার করা হয়।

এই সন্ত্রাসীকে পরিচিত করেছেন সাজ্জাদ আলী ওরফে বড় সাজ্জাদ নামের এক আরও বড় অপরাধীর সাথে যুক্ততা। বড় সাজ্জাদ বর্তমানে সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে অবস্থান করছেন। ইমন সেখানেই তাঁর সাথে ছিলেন। চট্টগ্রামে গত সময়ে যে কয়েকটি উল্লেখযোগ্য অপরাধ সংঘটিত হয়েছে, তার অনেকগুলিতেই তাঁর সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া গেছে। ইমনের নামে ইতিমধ্যে চট্টগ্রামের পাঁচটি থানায় পনেরটি মামলা রয়েছে।

যশোরের পুলিশ সুপার সৈয়দ রফিকুল ইসলাম জানিয়েছেন, গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে চেকপোস্ট স্থাপন করে ঝুমঝুমপুর এলাকায় অভিযান চালানো হয়েছিল। এই অপারেশনে যশোর জেলা গোয়েন্দা পুলিশের চারটি টিম এবং কোতোয়ালি থানার একটি টিম অংশ ছিল। চট্টগ্রাম জেলা গোয়েন্দা পুলিশও সহায়তা করেছে। গ্রেপ্তারের পর ডেভিড ইমনকে চট্টগ্রাম পুলিশের হেফাজতে ন্যস্ত করা হয়।

চেকপোস্টে ধরা পড়লে ডেভিড প্রথমে মিথ্যা ঠিকানা বলে পার পাওয়ার চেষ্টা করেছেন। তবে পুলিশের রয়েছিল নিখুঁত তথ্য যে তারা যশোরের ঝিকরগাছা এলাকা দিয়ে অবৈধভাবে দেশ ত্যাগ করতে চাইছেন। কোন চক্র বা সংস্থা তাদের এই পরিকল্পনায় সহায়তা করছিল, এই বিষয়ে তদন্ত চলছে। চট্টগ্রাম রেঞ্জের অতিরিক্ত উপমহাপরিদর্শক নাজিমুল হক জানিয়েছেন, চার দিন আগে যশোর সীমান্ত থেকে ডেভিড দেশে প্রবেশ করেছিলেন এবং ঢাকায় এসে পৌঁছেছিলেন। গোয়েন্দারা এই তথ্য পান এবং তাঁর উপর নজরদারি অব্যাহত রাখেন।

ডেভিডের কাছে দেশীয় এবং বিদেশি উভয় পাসপোর্ট পাওয়া গেছে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায় যে তিনি নিয়মিত দুই দেশের মধ্যে আসা-যাওয়া করতেন। বড় সাজ্জাদ এবং ইমন—উভয়েই দুবাই থেকে চট্টগ্রামে অপরাধ পরিচালনা করে এসেছেন।

চট্টগ্রাম জেলার পুলিশ সুপার মাসুদ আলম বলেছেন, যশোর থেকে তারা বৃহস্পতিবার সকালে চট্টগ্রামে ফিরে আসবেন। এই মুহূর্তে নোয়াখালীর সেনবাগ এলাকায় একটি বাড়িতে আরেক সন্ত্রাসী রায়হানকে গ্রেপ্তার করতে অভিযান চালানো হয়েছিল, কিন্তু তিনি দেয়াল টপকে পলায়ন করেন। পুলিশ তার সন্ধানে গোয়েন্দা অভিযান অব্যাহত রেখেছে।

চট্টগ্রাম পুলিশের এক সূত্র জানায় যে বিভিন্ন ইউনিটের পুলিশ সদস্যরা বছরের পর বছর একই এলাকায় দায়িত্ব পালন করেন। এর ফলে ডেভিডের মতো অনেক অপরাধীর সাথে তাদের গোপন সম্পর্ক তৈরি হয়ে যায়, এবং অনেক সময় পুলিশ সদস্যরা অবৈধভাবে তাদের তথ্য প্রদান করে সহায়তা করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

২০২৫ সালের ৩০ মার্চ চট্টগ্রাম নগরের বাকলিয়া এলাকায় মাইক্রোবাস ধাওয়া করে জোড়া খুনের ঘটনায় ইমন জড়িত। ওই বছরের ২৩ মে রাতে নগরের পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকতে তাঁর সহযোগীরা দাকাইয়া আকবর নামে আরেক সন্ত্রাসীকে হত্যা করে। বছরব্যাপী চাঁদাবাজি, অস্ত্র এবং হত্যাচেষ্টার বিভিন্ন মামলায় তার সংশ্লিষ্টতা প্রমাণিত।

গত ১০ মে চট্টগ্রামের জন্মাষ্টমী উদযাপন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক বিপ্লব দে নামে একজন সাংবাদিকের কাছে দেশীয় নম্বর থেকে ফোন করে ইমন ৫০ লাখ টাকা চাঁদা না দিলে ২৪ ঘন্টায় গুলি করার হুমকি দেন। তিনি বলেন, 'তোর শরীর বোলতার বাসা বানিয়ে দিব। পুরো শরীরে এমনভাবে গুলি করা হবে, পরিবার গণনাই করতে পারবে না। যা করার, আগামী ২৪ ঘণ্টায় করতে হবে। গুলি মানুষ চেনে না'। বিপ্লব দে পরে এই ঘটনার সাধারণ ডায়েরি নগরের কোতোয়ালি থানায় করেন।

চলতি বছরের ২৬ জানুয়ারি চট্টগ্রামের আজিজ উদ্দিন নামে এক ব্যক্তিকে হুমকি দেন ইমন। বলেন, '৫০ হাজার পুলিশ নিয়ে থাকলেও ঘরে গিয়ে মেরে দেব। তোর ভাইকে যেমন ১০ হাজার মানুষের সামনে গুলি করে মেরেছি।' আজিজ ছিলেন বায়েজিদ বোস্তামী থানা শ্রমিক দলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক। ইমন তাকে আরও হুমকি দিয়ে বলেন, 'কয়েক দিন ঘরে বসে থাকবি? প্রশাসন কত দিন পাহারা দেবে? ১টি খুন করলে যে সাজা, ১০টি করলেও সেই সাজা'।

২০২৫ সালের ৮ আগস্ট চন্দনপুরা এলাকায় স্মার্ট গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মুজিবুর রহমানের বাড়িতে গুলি চালায় ইমন-রায়হান গ্রুপ। মুজিবুর রহমান জানান, বিদেশি মোবাইল নম্বর থেকে বড় সাজ্জাদের নামে ফোন করে চাঁদা দাবি করা হয়েছিল এবং 'আমি রায়হান, চাঁদা না দিলে মাথার খুলি উড়িয়ে দেব' বলা হয়েছিল। পরে তার বাড়িতে দুবার গুলি করা হয়।

১ আগস্ট রাত সাড়ে ১০টায় নগরের মোহরায় মোহাম্মদ ইউনুসের বাসায় সশস্ত্র একদল গুলি করে। তারা চিল্লিয়ে বলে, 'সাজ্জাদ ভাইয়ের কথা ভালো লাগে নাই, এবার কবরে যা'। এই কথার সাথেই গুলিবর্ষণ করে চলে যায় তারা।

২০২৫ সালের ১৪ ডিসেম্বর চট্টগ্রাম নগরের পাঁচলাইশ হামজারবাগ এলাকার মুরাদপুর-অক্সিজেন সড়কের পাশে একটি নির্মাণাধীন ভবনে হামলা এবং গুলি চালায় ইমন এবং তার অনুসারীরা। ওই ভবনের মালিককে আগেই ৫০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয়েছিল।

এ ছাড়া গত বছরের ২৫ অক্টোবর রাউজানে যুবদলের কর্মী আলমগীর আলমকে লক্ষ্য করে, গত ২৫ জুলাই কালুরঘাট এলাকার একজন ওষুধের দোকানদারকে ফোনে হুমকি দিয়ে, এবং কালুরঘাট শিল্প এলাকায় গার্মেন্টস ফ্যাক্টরিতে গুলি চালিয়ে ইমন-রায়হান গ্রুপ অপরাধ কর্মকাণ্ড পরিচালনা করেছে।

সাধারণ একজন তরুণ মোবারক হোসেন কীভাবে দুর্ধর্ষ অপরাধী ডেভিড ইমনে রূপান্তরিত হয়েছেন, তা চট্টগ্রামের সকল শ্রেণির মানুষের কাছে এক ভয়ের নাম হয়ে উঠেছে। ইমন ফটিকছড়ি উপজেলার কাঞ্চননগরের কৃষক মো. মুসার ছেলে।

পুলিশ জানায়, ইমনের কাছে ১৫ থেকে ২০টি ভারী অস্ত্র এবং পিস্তল রয়েছে এবং অস্ত্র ব্যবহারে তিনি অত্যন্ত দক্ষ। খুন এবং চাঁদাবাজি তার জীবনের নেশা এবং পেশা হয়ে উঠেছে। ছোট সাজ্জাদের সাথে কারাগারে পরিচয় হওয়ার পর তিনি বড় সাজ্জাদের দলে যোগ দেন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর ইমন এবং রায়হান কারাগার থেকে জামিনে বেরিয়ে আসেন এবং তখন থেকে তারা সাজ্জাদ গ্রুপের সাথে বেপরোয়া অপরাধ কর্মকাণ্ড শুরু করে।

হাটহাজারী, রাউজান, রাঙ্গুনিয়া এবং মহানগরের চান্দগাঁও, বায়েজিদ ও পাঁচলাইশ—এই ছয় থানার আনুমানিক ১৫ লক্ষ মানুষের নিদ্রা হরণ করেছে ইমন গ্রুপ। গত দেড় বছরে চট্টগ্রামে সংঘটিত ১১টি খুন সহ বিভিন্ন অপরাধে ইমনের সম্পৃক্ততা প্রমাণিত।

চট্টগ্রাম পুলিশ কর্মকর্তারা বলেন, বিদেশে পলাতক প্রভাবশালী সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলীর পক্ষে চট্টগ্রামে অপরাধ নেতৃত্ব দেওয়া দুজনের একজন হলেন ডেভিড ইমন। আগে এই দায়িত্ব পালন করতেন ছোট সাজ্জাদ, যিনি এখন কারাগারে। তার পর থেকে ডেভিড ইমন এবং মোহাম্মদ রায়হান সাজ্জাদ গ্রুপের সম্পূর্ণ নেতৃত্ব সামলাচ্ছিলেন। এখন সাজ্জাদ বাহিনীর তিনজন নেতার মধ্যে শুধুমাত্র রায়হান অবশিষ্ট রয়েছেন। পনেরটি মামলার এই আসামি এখনও পুলিশের ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়েছেন।

মন্তব্য (0)

মন্তব্য নীতি

এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনি করুন।