বৃহস্পতিবার, ১৩ আগস্ট ২০২৬

প্রতিশ্রুত টাকা পাননি কিডনি দানকারী, আদালতে ফিরেছেন প্রতারণার অভিযোগ নিয়ে

2 সপ্তাহ আগে | আপডেট: 4 দিন আগে | সারাদেশ

Administrator

প্রতিশ্রুত টাকা পাননি কিডনি দানকারী, আদালতে ফিরেছেন প্রতারণার অভিযোগ নিয়ে

জয়পুরহাটের এক দিনমজুর তার বিক্রীত কিডনির জন্য প্রতিশ্রুত ১০ লাখ টাকার মাত্র ৫০ হাজার টাকা পেয়ে প্রতারণার শিকার হয়েছেন। অঙ্গ চোরাকারবারি নেটওয়ার্কের বিরুদ্ধে তিনি আদালতে মামলা করেছেন।

সর্বশেষ সব খবরের জন্য দৈনিক খবর সংযোগের গুগল নিউজ চ্যানেল অনুসরণ করুন।

জয়পুরহাটের কালাই উপজেলায় এক দিনমজুর তার বিক্রীত কিডনির মূল্যে নিযুক্ত টাকা না পেয়ে আইনি পথে প্রতিকার খুঁজেছেন। মন্টু মিয়া নামের এই ব্যক্তি দশজন ব্যক্তির বিরুদ্ধে প্রতারণার অভিযোগে দরখাস্ত করেছেন। গত ১৩ জুন জয়পুরহাটের আমলি আদালত-৫-এ আবেদনের পর থানার পুলিশ আদালতের নির্দেশে এফআইআর নথিভুক্ত করেছে।

পার্শ্ববর্তী গাইবান্ধা জেলার গোবিন্দগঞ্জ পৌরশহর থেকে আসা ৪৬ বছর বয়সী মন্টু মিয়া চরম দারিদ্র্যের কারণে এই পদক্ষেপে বাধ্য হয়েছিলেন। বিভিন্ন এনজিও এবং স্থানীয় উৎস থেকে ঋণ নিয়ে সেগুলোর কিস্তি পরিশোধে অসমর্থ হয়ে পড়েন তিনি। তার আর্থিক সংকটের খবর পেয়ে স্থানীয় কয়েকজন দালাল তাকে অঙ্গ বিক্রয়ের প্রস্তাব দেয়। ঢাকার এক নারীর কিডনি প্রয়োজনীয়তার অছিলা দিয়ে তাকে ১০ লাখ টাকার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়।

প্রাথমিক আপত্তি থাকলেও দালালদের পুনরাবৃত্ত অনুরোধে মন্টু মিয়া সম্মতি দেন। এর পর তারা তার পাসপোর্ট তৈরি করে দেয় এবং চলতি বছরের প্রথম সপ্তাহে তাকে নেপালে নিয়ে যায়। সেখানকার একটি হাসপাতালে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে তার একটি কিডনি অন্য প্রাপকের দেহে স্থানান্তরিত করা হয়। সুস্থতার পর ১৭ ফেব্রুয়ারি তাকে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়, কিন্তু চুক্তি অনুযায়ী ১০ লাখ টাকার পরিবর্তে মাত্র ৫০ হাজার টাকা প্রদান করা হয়।

মামলার নালিশে উল্লেখিত ছয় জন নাম প্রাপ্ত আসামির মধ্যে রয়েছেন: বগুড়া সদর উপজেলার নিশিন্দারা গ্রামের সাব্বির আহমেদ, শিবগঞ্জের কিচক মল্লিকপাড়া থেকে সুমন আলী, জয়পুরহাটের উদয়পুর ইউনিয়নের পাইকপাড়া গ্রাম থেকে আব্দুল মান্নান ও সাইদুর রহমান, লওনা গ্রামের আব্দুস ছাত্তার এবং নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ উপজেলার তারেক আজম ওরফে বাবলু চৌধুরী। এছাড়াও তিন থেকে চারজন অজ্ঞাতনামা ব্যক্তি আসামি রয়েছেন। আন্তর্জাতিক অঙ্গ ব্যবসায়ে তারেক আজম একজন পরিচিত মধ্যস্থতাকারী হিসেবে পরিচিত, যিনি ঢাকার রায়েরবাগ এলাকা থেকে সংযোগ স্থাপন করেন এবং অঙ্গ ক্রয়-বিক্রয় পরিচালনা করেন।

বাকি ৯ লাখ ৫০ হাজার টাকার বিষয়ে মন্টু মিয়া বিভিন্ন সময় অভিযুক্তদের কাছ থেকে শুধু অস্বীকৃতি পেয়েছেন। স্থানীয় মধ্যস্থতাকারীদের হস্তক্ষেপ সত্ত্বেও প্রতিশ্রুত অর্থ পরিশোধ করা হয়নি। সমকালের সাথে সংলাপে মন্টু মিয়া জানান যে কিডনি অপসারণের পর থেকে তার কর্মক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে। তিনি পরিবারের একমাত্র আয়ের উৎস হওয়ায় এই স্বাস্থ্য সংকট পুরো পরিবারকে অনিশ্চয়তায় ফেলে দিয়েছে।

জয়পুরহাটের সিভিল সার্জন ডা. আল মামুন চিকিৎসাগত জটিলতার বিষয়ে ব্যাখ্যা করেন। সুস্থ মানুষের একটি কিডনি হারিয়ে গেলে অবশিষ্ট কিডনিটি অতিরিক্ত চাপে কাজ করতে থাকে এবং সময়ের সাথে সাথে আকারে বৃদ্ধি পায়। এর ফলে বিভিন্ন স্বাস্থ্য সমস্যা দেখা যায় এবং সারা জীবন ঝুঁকি থেকে যায়।

জয়পুরহাটের একজন অভিজ্ঞ আইনজীবী উজ্জ্বল হোসেন মন্তব্য করেন যে দারিদ্র্য এবং অসহায়তার সুযোগ নিয়ে যদি কাউকে দেশের বাইরে নিয়ে গিয়ে প্রতারণার মাধ্যমে অঙ্গ সংগ্রহ করা হয়, তাহলে এটি শুধু প্রতারণা নয়, সংগঠিত এবং গুরুতর অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হয়। বিশেষজ্ঞ মতে, অভিযোগ প্রমাণিত হলে দণ্ড আইনের সর্বোচ্চ শাস্তি প্রয়োগ করা প্রয়োজন।

কালাই থানার ওসি রফিকুল ইসলাম জানান যে আদালতের আদেশ অনুযায়ী মানবদেহে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সংযোজন আইন, ১৯৯৯-এর অধীনে এই মামলা পরিচালিত হচ্ছে। এর সাথে মানব দেহের অঙ্গ অপসারণ, প্রতারণামূলক আর্থিক লেনদেন এবং সহযোগিতামূলক অপরাধের অভিযোগও যুক্ত রয়েছে। তদন্ত প্রক্রিয়া গুরুত্বসহকারে অব্যাহত আছে এবং প্রয়োজনীয় প্রমাণ সংগ্রহ এবং আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের কাজ চলছে।

মন্তব্য (0)

মন্তব্য নীতি

এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনি করুন।