হাম সংক্রমণে বাংলাদেশ বৈশ্বিক শীর্ষে, টিকাকরণে গুরুতর ঘাটতি চিহ্নিত
Administrator
বাংলাদেশ ডিসেম্বর ২০২৪ থেকে মে ২০২৫-এ বিশ্বে সর্বোচ্চ হাম রোগী রেকর্ড করেছে, যেখানে ৪২ হাজার ১৭৪ জন সংক্রমিত হয়েছে এবং ৭৯৭ শিশু মৃত্যুবরণ করেছে। টিকাকরণ কভারেজ ৫৯ শতাংশে হ্রাস পেয়েছে, ২০২৫ সালে সরকারের ভ্যাকসিন সংগ্রহ নীতি পরিবর্তনের কারণে সংকট গভীর হয়েছে।
বিশ্বব্যাপী হাম সংক্রমণ গত ছয় মাসে ক্রমবর্ধমান উদ্বেগের বিষয়ে পরিণত হয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) নজরদারি প্রতিবেদন অনুযায়ী, ডিসেম্বর ২০২৪ থেকে মে ২০২৫ পর্যন্ত একযোগে ১৬৫টি দেশে মোট ১ লাখ ৮৬ হাজার হাম বা এর সন্দেহজনক রোগী পাওয়া গেছে। দক্ষিণ এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য এবং আফ্রিকার বিভিন্ন প্রান্তে এই রোগের সর্বোচ্চ প্রাদুর্ভাব লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
বাংলাদেশ এই সংকটে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত দেশ হিসেবে উঠে এসেছে। একই সময়কাল জুড়ে দেশটিতে ৪২ হাজার ১৭৪ জন হাম অথবা এর উপসর্গ নিয়ে রোগী শনাক্ত হয়েছে, যা বৈশ্বিক তুলনায় সর্বাধিক। পরবর্তী তালিকায় ভারত স্থান নিয়েছে ২৬ হাজার ৬০৭ কেসের সাথে, তৃতীয় অবস্থানে ইয়েমেন ১৪ হাজার ৫২১ জন নিয়ে রয়েছে। শীর্ষ দশকে অন্যান্য দেশ হল মেক্সিকো (১২,৪৯৫), পাকিস্তান (১১,০৩৭), ক্যামেরুন (৯,৬৫৩), কাজাখস্তান (৭,৭৩০), গুয়েতেমালা (৬,৮৩২), অ্যাঙ্গোলা (৬,৮১৫) এবং সুদান (৫,৭৬৬)।
বাংলাদেশে রোগের বিস্তার অপ্রত্যাশিত হারে দ্রুততর হয়েছে। মার্চ মাসে হঠাৎ করে শিশুদের মধ্যে আক্রান্তের সংখ্যা ৫ হাজারে পৌঁছায়। পরের মাস এপ্রিলে এটি ২০ হাজার ছাড়িয়ে যায়, আর মে মাসে ১৫ হাজারে স্থিত হয়। মার্চ মাসের ১৫ তারিখ থেকে গণনা শুরু করে, মাস জুড়ে ১ লাখ ১৯ হাজার ৪৪৮ জন সন্দেহজনক রোগীর সাথে ১৪ হাজার ৭০৮ জন নিশ্চিত রোগী রেকর্ড করা হয়েছে।
এই প্রাদুর্ভাব শিশুদের জীবনে বিধ্বংসী প্রভাব ফেলেছে। হাম এবং সম্পর্কিত জটিলতায় মৃত্যু হয়েছে ৭০২ জনের এবং নিশ্চিত রোগীর ক্ষেত্রে ৯৫ জনের - সর্বমোট ৭৯৭ শিশু। মৃতদের ৫২ শতাংশ নয় মাসের নিচে বয়সী ছিল। ঢাকার বাংলাদেশ শিশু হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের ওপর পরিচালিত অধ্যয়ন প্রকাশ করে যে আক্রান্ত শিশুদের ৮০ শতাংশ কোনো টিকা পায়নি।
বাংলাদেশের এই বর্তমান সংকট আগের বছরগুলোর তুলনায় অভূতপূর্ব। প্রমাণস্বরূপ, ২০২৫ সালে শুধুমাত্র ১৩২ জন রোগী শনাক্ত হয়েছিল, ২০২৪-এ ২৪৭, ২০২৩-এ ২৮২ এবং ২০২২-এ ৩১১ জন। এই পার্থক্য রোগের হঠাৎ এবং ব্যাপক পুনরাবির্ভাবকে স্পষ্ট করে।
সংক্রমণের বৃদ্ধিতে সবচেয়ে বড় অবদান হল টিকাকরণ প্রোগ্রামে গুরুতর হ্রাস। প্রাথমিক দশকগুলোয় বাংলাদেশ ভ্যাকসিনেশনে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছিল। ২০০৬-এর জাতীয় হাম টিকাদান উদ্যোগে ৩ কোটি ৪২ লাখ শিশুর লক্ষ্য সম্পূর্ণভাবে অর্জিত হয়েছিল। ২০১০-এ পরবর্তী পর্যায়ে ১ কোটি ৮১ লাখ শিশু একই সম্পূর্ণতার সাথে টিকাকৃত হয়েছিল। ২০১৪-এর হাম-রুবেলা প্রচারাভিযানে ৫ কোটি ২৭ লাখ শিশুকে ১০০ শতাংশের ঊর্ধ্বে কভারেজ সহ টিকা দেওয়া হয়েছিল।
গত পাঁচ বছরে এই গতিবেগ সম্পূর্ণভাবে হারিয়ে গেছে। ২০২০-২১ সালের পর বিশেষ টিকাদান প্রচারাভিযান সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়। একই সময়ে নিয়মিত টিকাকরণের হার ক্রমাগত হ্রাস পেতে থাকে এবং ২০২৫ সালে তা মাত্র ৫৯ শতাংশে নেমে আসে। একাধিক অঞ্চলে ভ্যাকসিনের তীব্র অভাব পরিলক্ষিত হয়েছে।
টিকা ক্রয়ের নীতিগত পরিবর্তন পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। জাতিসংঘ শিশু সংস্থা ইউনিসেফের বাংলাদেশ প্রতিনিধি স্ট্যানলি গুয়াভুইয়া জানিয়েছেন যে ২০২৫ সালে অন্তর্বর্তী সরকার যখন ঐতিহ্যবাহী সংগ্রহ পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছিল, তখন ইউনিসেফ বারবার তার উদ্বেগ প্রকাশ করেছিল। তারা পূর্বাভাস দিয়েছিল যে এই পদক্ষেপ ভ্যাকসিন বিতরণে দীর্ঘস্থায়ী বিলম্ব এবং রোগের পুনরাবির্ভাব আনতে পারে। যাইহোক, সেই সতর্কতা অনুশীলনে পরিণত হয়নি।
সবচেয়ে দুর্বলদের মধ্যে শিশুরা সর্বাধিক ঝুঁকিতে রয়েছে। ডব্লিউএইচওর তথ্য দেখায় যে এক বছরের নিচে আনুমানিক ৫ হাজার আক্রান্ত শিশুর মধ্যে ৪ হাজারের বেশি হাম ভ্যাকসিনের কোনো ডোজই পায়নি। এক থেকে চার বছর বয়সী ৪ হাজার রোগীর মধ্যে দেড় হাজার কোনো টিকা মিস করেছে এবং প্রায় ৫০০ জন শুধুমাত্র একটি ডোজ পেয়েছে। পাঁচ থেকে নয় বছরের দলে, অর্ধেক শিশু টিকার বাইরে ছিল।
বিশেষজ্ঞরা ব্যাখ্যা করেন যে হার্ড ইমিউনিটি অর্জনের জন্য কমপক্ষে ৯৫ শতাংশ শিশু জনসংখ্যাকে দুটি ডোজ দিয়ে সুরক্ষিত করতে হয়। হাম পৃথিবীর সবচেয়ে সংক্রামক রোগের একটি - একজন সংক্রমিত ব্যক্তি ১২ থেকে ১৮ জনকে আক্রান্ত করতে পারে। যখন যথাযথ ইমিউনিটি স্তর অর্জিত হয়, সংক্রমণের চেইন ভেঙে যায় এবং কম টিকাপ্রাপ্ত সম্প্রদায়ও সুরক্ষিত থাকে।
রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) সাবেক পরিচালক অধ্যাপক মাহমুদুর রহমান সতর্ক করেছেন যে ইমিউনিটি গ্যাপ তৈরিতে সময় লাগে না, কিন্তু পুনঃপ্রতিষ্ঠায় সময় প্রয়োজন। যদি দুই বছর ধরে প্রয়োজনীয় কভারেজ হারিয়ে যায়, তখন সুরক্ষার শৃঙ্খলে ক্রমাগত ফাঁক দেখা দেয়। এই ফাঁকগুলো ভবিষ্যতে প্রধান প্রাদুর্ভাবের জন্য প্রজনন ক্ষেত্র তৈরি করে।
বর্তমান সরকার এপ্রিল ২০২৬-এ পাঁচ বছর পর্যন্ত শিশুদের জন্য একটি বিশেষ টিকাদান ক্যাম্পেইন শুরু করেছে। কিন্তু কার্যকর বাস্তবায়নে উল্লেখযোগ্য বাধা সম্মুখীন হয়েছে। ১ কোটি ৮০ লাখ ১৫ হাজার ৬৪ শিশুকে কভার করার পরিকল্পনা থাকলেও ৪৬ লাখ শিশু প্রোগ্রাম থেকে বাদ পড়েছে। জুনে একই বয়স গোষ্ঠীর ২ কোটি ২৬ লাখ শিশু ভিটামিন এ ক্যাম্পেইনে পৌঁছেছে, যা সমন্বয়ের অভাব প্রকাশ করে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ড. মুশতাক হোসেন তীক্ষ্ণভাবে সমালোচনা করেছেন যে এত ব্যাপক সংখ্যক শিশু টিকাদান থেকে বঞ্চিত হওয়া অত্যন্ত গুরুতর পরিণতি। শুধুমাত্র এই শিশুরাই নয়, সমাজের বৃহত্তর অংশ এই ব্যর্থতার প্রভাব বহন করবে। তিনি স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন যে টিকাকরণে বাংলাদেশের এক সময় ছিল বৈশ্বিক স্বীকৃতি, যা এখন হ্রাস পাচ্ছে। তার দৃষ্টিতে, বর্তমান প্রশাসন প্রতিশ্রুতি এবং সম্পাদনে একটি বিশাল ব্যবধান প্রদর্শন করছে।
আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং অংশীদাররা জোর দিয়ে বলছে যে টিকাদান নেটওয়ার্কের বাইরে থাকা প্রতিটি শিশুকে দ্রুত সনাক্ত করে অন্তর্ভুক্ত করা আজ অপরিহার্য। এই শিশুরা কেবল নিজেরাই দুর্বল নয়, অন্যদের জন্যও সংক্রমণের বাহক হতে পারে। সংস্থাগুলো নিশ্চিত করছে যে সম্পূর্ণ সুরক্ষা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত অগ্রগামী প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকা অত্যাবশ্যক।
মন্তব্য (0)
মন্তব্য নীতিএখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনি করুন।