সরকারি চাকরিজীবীদের নতুন পে-স্কেল প্রকাশে বিলম্ব, আর্থিক ও প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ
Administrator
নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নে সরকার অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা ও প্রযুক্তিগত জটিলতার সম্মুখীন হয়েছে, যার ফলে সাড়ে চৌদ্দ লাখ কর্মচারীর বেতন বৃদ্ধি আরও অপেক্ষার মুখে।
সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য গৃহীত নতুন পে-স্কেল জুলাই থেকে কার্যকরের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে, কিন্তু এর বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় রয়েছে অসংখ্য বাধা। অর্থনৈতিক সংকট ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের সতর্কবার্তা সামনে রেখে সরকার এই পদক্ষেপ গ্রহণে সতর্ক হয়ে উঠেছে। নতুন পে-স্কেল ও সংশ্লিষ্ট খরচ পূরণে অতিরিক্ত প্রায় ৪৪ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ করতে হবে, যা বর্তমান আর্থিক পরিস্থিতিতে সম্ভব নয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী সাড়ে ১৪ লাখ সরকারি কর্মচারীর জন্য ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বেতন ও ভাতা বাবদ ৯০ হাজার কোটি টাকা এবং পেনশন ও গ্রাচুইটিসহ মোট ১ লাখ ৪১ হাজার কোটি টাকা নির্ধারিত হয়েছে।
নতুন পে-স্কেল চূড়ান্ত করতে এখন প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে মন্ত্রিপরিষদ সচিবের নেতৃত্বে গঠিত উচ্চপর্যায়ের সচিব কমিটির পর্যালোচনা প্রক্রিয়া। নতুন বেতন কাঠামোর আর্থিক ব্যয়, গ্রেডের সংখ্যা, সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ বেতনের বিন্যাস, বার্ষিক বৃদ্ধি এবং বিভিন্ন ভাতার প্রভাব যাচাই করে সমন্বিত প্রস্তাব তৈরির কাজ চলছে এই কমিটিতে। বেতন কমিশনের সুপারিশ পর্যালোচনা সহ অষ্টম পে-স্কেলের ত্রুটি চিহ্নিত করতে আরও দুই থেকে তিনটি প্রযুক্তিগত আলোচনার সভা অপেক্ষা করছে কমিটি। কমিটির সুপারিশ চূড়ান্ত হলে তা অর্থ মন্ত্রণালয়ের যাচাই এর পর মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হবে। সরকারের আনুষ্ঠানিক অনুমোদন পেলেই কেবল গেজেট প্রকাশ এবং বাস্তবায়ন প্রজ্ঞাপন জারি করা সম্ভব হবে।
চূড়ান্ত করার ক্ষেত্রে সরকারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো আর্থিক সামর্থ্য নির্ধারণ করা। মূল বেতন বৃদ্ধি মানে শুধু বর্তমান কর্মীদের বেতন বৃদ্ধি নয়, বরং তা অবসরপ্রাপ্তদের পেনশন, কর্মরত কর্মীদের বাড়িভাড়া এবং অন্যান্য ভাতা এবং গ্র্যাচুইটি সহ অবসর-সুবিধায় বৃদ্ধি আনবে। এই কারণে একটি সম্ভাব্য সমাধান হিসেবে সরকার প্রথমে মূল বেতন বৃদ্ধি বাস্তবায়ন করে পরবর্তীতে অন্যান্য ভাতা যেমন বাড়িভাড়া, চিকিৎসা, যাতায়াত সমন্বয় করার কথা বিবেচনা করছে।
অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারীদের মধ্যেও নতুন পে-স্কেল নিয়ে উৎসাহ রয়েছে। পেনশন সমন্বয়ের পদ্ধতি, সর্বনিম্ন পেনশন বৃদ্ধি এবং নতুন ও পুরাতন পেনশনভোগীদের মধ্যে সুবিধার বৈষম্য কীভাবে সমাধান করা হবে সেটা এখনো চূড়ান্ত করা হয়নি। অর্থ বিভাগ থেকে এ পর্যন্ত কোনো নির্দিষ্ট হার বা সূত্র প্রকাশ পায়নি। নতুন নীতি বাস্তবায়নের আগে ও পরে অবসরে যাওয়া ব্যক্তিদের জন্য স্পষ্ট মানদণ্ড না থাকলে বৈষম্যের অভিযোগ উঠতে পারে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত অবকাঠামো তৈরিও একটি বড় চ্যালেঞ্জ। বর্তমানে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন, ইনক্রিমেন্ট, কর্তন, বিভিন্ন ভাতা, আয়কর এবং পেনশনের হিসাব সমন্বিত বাজেট ও হিসাব ব্যবস্থা অর্থাৎ আইবিএএস প্লাস প্লাসের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। নতুন গ্রেড ও বেতন কার্যকর করতে সফটওয়্যারে নতুন বেতন ম্যাট্রিক্স অন্তর্ভুক্ত করতে হবে এবং প্রতিটি কর্মকর্তা-কর্মচারীর বর্তমান বেতন স্বয়ংক্রিয়ভাবে নতুন কাঠামোর কোন পর্যায়ে স্থাপিত হবে তা নির্ধারণ করতে হবে। এছাড়া সেবা রেকর্ড, পদবি, গ্রেড এবং ইনক্রিমেন্টের তথ্য সঠিক রেখে না গেলে বেতন নির্ধারণে জটিলতা দেখা দিতে পারে। তবে এ পর্যন্ত নবম পে-স্কেল বাস্তবায়নের জন্য কোনো আইবিএএস বিষয়ক বিজ্ঞপ্তি বা নির্দেশনা সরকার থেকে প্রকাশিত হয়নি।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা জানিয়েছেন যে মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনির সভাপতিত্বে পরিচালিত সচিব কমিটি বেতন কমিশনের সুপারিশ এবং অষ্টম পে-স্কেলের ত্রুটিবিষয়ক পর্যালোচনার কাজ ধারাবাহিকভাবে চালিয়ে যাচ্ছে। আগামী দুই থেকে তিনটি কারিগরি ও বিশ্লেষণমূলক বৈঠক শেষ করে কমিটি তার সুপারিশ মন্ত্রিসভায় পাঠাবে। যদি সব কিছু সুবিধাজনক থাকে তাহলে আগস্ট মাসের মধ্যে চূড়ান্ত গেজেট প্রকাশিত হতে পারে। তবে তিনি এই মর্মেও নিশ্চয়তা দিয়েছেন যে গেজেট প্রকাশে বিলম্ব হলেও নতুন বেতন ১ জুলাই ২০২৬ থেকে কার্যকর গণ্য করা হবে এবং চাকরিজীবীরা সে অনুযায়ী বকেয়া পাবেন।
সাবেক সচিব এ কে এম আবদুল আউয়াল মজুমদার নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়ন সম্পর্কে বলেছেন, সরকারি কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধি মূল্যস্ফীতির পরিপ্রেক্ষিতে অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। একই সাথে তিনি জোর দিয়েছেন যে সরকারের আর্থিক সামর্থ্য কত তা গুরুত্বের সাথে মূল্যায়ন করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
মন্তব্য (0)
মন্তব্য নীতিএখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনি করুন।