রেলপথে নিরাপত্তার সংকট গভীর: দিনাজপুরে বিপুল স্লিপার ক্ষতিগ্রস্ত
Administrator
দিনাজপুর-বগুড়া রেলপথের ৭৭ কিলোমিটার অংশ গুরুতর নিরাপত্তা ঝুঁকিতে রয়েছে। শত শত ক্ষতিগ্রস্ত স্লিপার এবং অপর্যাপ্ত জনবল দুর্ঘটনার সম্ভাবনা বাড়াচ্ছে।
ফুলবাড়ী থেকে সান্তাহার পর্যন্ত ৭৭ কিলোমিটার বিস্তৃত রেলপথ দিনাজপুর ও জয়পুরহাটের বিভিন্ন এলাকা অতিক্রম করে। এই লাইনে অবস্থিত রয়েছে বিরামপুর, হিলি (হাকিমপুর), পাঁচবিবি, বাগজানা, তিলকপুর ও জামালগঞ্জের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্টেশন ও জনবসতি। রেলপথের একাধিক স্থানে কংক্রিটের স্লিপার মারাত্মক ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত রয়েছে, যা যাত্রীদের জন্য গুরুতর ঝুঁকি সৃষ্টি করেছে। অনেক অংশে রেলপথ ধরে রাখার প্যান্ড্রল ক্লিপ উপস্থিত নেই। রেলের সংযোগ স্থানগুলি নড়বড়ে অবস্থায় রয়েছে এবং ট্রেনের চাপে রেলপথ ঊর্ধ্বমুখী ও নিম্নমুখী গতিশীল হয়।
গত বছরের ১৮ মার্চ ঢাকা শহর থেকে ছেড়ে আসা নীলসাগর এক্সপ্রেস ট্রেনটি বগুড়ার আদমদীঘি উপজেলায় অবস্থিত বাগবাড়ী এলাকায় রেল থেকে খসে পড়ে। এতে ট্রেনের নয়টি কোচ লাইনচ্যুত হয় এবং দুই শতাধিক যাত্রী গুরুতর আঘাত পান। এই ভয়াবহ দুর্ঘটনার পরবর্তী সময় থেকেই এই বিভাগে ট্রেনের গতিবেগ উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস করা হয়। তবে এত দিন পর্যন্ত রেলপথটির যথাযথ মেরামত ও সংস্কারের কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি বলে স্থানীয় জনসাধারণের অভিযোগ, যার ফলে দুর্ঘটনার পুনরাবৃত্তির আশঙ্কা ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে।
কৃষকের তৎপরতায় দুর্যোগ রোধ
এ বছরের ২৩ মার্চ প্রভাতে ফুলবাড়ী ও বিরামপুর রেলপথের ৩৫২/৫ থেকে ৩৫২/৬ কিলোমিটার অংশে কংক্রিটের স্লিপার ভেঙে যাওয়ার ঘটনা পরিলক্ষিত হয়। এই ক্ষতি প্রথম আবিষ্কার করেন স্থানীয় কৃষক এনামুল হক, যার বয়স ছিল ৬৫ বছর। তিনি কোনো দেরি না করে কলা গাছের লাল পাতা ব্যবহার করে সতর্কতার সংকেত প্রদান করেন এবং ঢাকা থেকে পঞ্চগড়গামী পঞ্চগড় এক্সপ্রেস ট্রেনটিকে জরুরি ভিত্তিতে থামিয়ে দেন। এই দ্রুত পদক্ষেপের ফলে ট্রেনের সকল যাত্রী সম্ভাব্য বিপর্যয় থেকে নিরাপদ থাকেন।
মোবারকপুর রেলগেটের একজন খুচরা ব্যবসায়ী হামিদুল হক ও অন্যান্য স্থানীয় বাসিন্দারা জানান যে, রেলপথের ৩৬৪/১ থেকে ৩৬৪/৪ কিলোমিটার বিস্তৃত এলাকায় অসংখ্য স্লিপার বিভিন্ন মাত্রায় ক্ষতিগ্রস্ত রয়েছে। কতিপয় স্থানে কংক্রিট সম্পূর্ণভাবে ভেঙে ভেতরের স্টিল রড উন্মুক্ত হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই কারণে রেলপথকে স্থিতিশীল রাখার জন্য ব্যবহৃত প্যান্ড্রল ক্লিপগুলি হারিয়ে গেছে। এর ফলে যখনই ট্রেন এই এলাকার মধ্য দিয়ে অতিক্রম করে, রেলপথ অত্যন্ত বিপজ্জনকভাবে উপরে ও নিচে নড়চড়া করতে দেখা যায়।
রেলওয়ে বিভাগের কর্মসূচি অনুযায়ী, এই ৭৭ কিলোমিটার দীর্ঘ রেলপথের রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচর্যায় নিয়োজিত পদসমূহের অর্ধেকেরও বেশি অধুনা খালি অবস্থায় রয়েছে। উপসহকারী প্রকৌশলীর পদটি সম্পূর্ণভাবে শূন্য। কীম্যানদের জন্য নির্ধারিত ১০টি পদ খালি, যদিও এই কর্মীদের প্রতিটি প্রভাতে সাতটি নাগাদ রেলপথ পরিদর্শন করে রিপোর্ট জমা দেওয়ার কর্তব্য রয়েছে। ট্রলিম্যান হিসেবে চারটি পদের মধ্যে একজন মাত্র কর্মরত, নিরাপত্তা প্রহরীর তিনটি পদে একমাত্র কর্মচারী নিয়োজিত এবং বেলোম্যান পদের দুটিই সম্পূর্ণ খালি। হ্যামারম্যান হওয়ার কথা তিনজন হলেও বর্তমানে একজনই কাজ করছেন।
ফুলবাড়ী রেলস্টেশনের স্টেশন মাস্টার আনন্দ চক্রবর্তী জানিয়েছেন যে, এই স্টেশন দিয়ে প্রতিদিন ট্রেনের আগমন ও প্রস্থান উভয় দিকে বারোটি করে মোট চব্বিশটি ট্রেন চলাচল করে। ৩৬৫/৪ থেকে ৩৬৫/৫ কিলোমিটার পর্যন্ত রেলপথের এই অংশটি উল্লেখযোগ্যভাবে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত। এই কারণে গত ২৫ এপ্রিল তারিখে পার্বতীপুর বিভাগের ঊর্ধ্বতন সহকারী প্রকৌশলী (পথ) শেখ আল আমিন এই এলাকায় ট্রেন চলাচলের গতিবেগ ঘণ্টায় মাত্র দশ কিলোমিটারে সীমাবদ্ধ করার নির্দেশনা জারি করেন।
ঊর্ধ্বতন সহকারী প্রকৌশলী শেখ আল আমিন স্বীকার করেছেন যে, তাদের দল ঝুঁকিপূর্ণ কংক্রিটের স্লিপারগুলি ক্রমপর্যায়ে নতুন স্লিপার দিয়ে প্রতিস্থাপন করছে। তথাপি, কর্মীদের সীমিত সংখ্যার কারণে এই কাজের অগ্রগতি অত্যন্ত মন্থর গতিতে সম্পন্ন হচ্ছে। তিনি মন্তব্য করেছেন যে, যদি এই মেরামতকাজ ঠিকাদার কর্পোরেশনের মাধ্যমে পরিচালিত হতো তাহলে কাজটি দ্রুততার সাথে সম্পন্ন হতে পারত।
পাকশী রেলওয়ে বিভাগের ঊর্ধ্বতন সহকারী প্রকৌশলী (পথ) ভবেশ চন্দ্র রাজবংশী উল্লেখ করেছেন যে, এই রেলপথের সম্পূর্ণ ও দীর্ঘস্থায়ী সংস্কারের জন্য তিনটি ঠিকাদার নিয়োগের দরপত্র ইতিমধ্যে আহ্বান করা হয়েছে। তিনি প্রত্যাশা করছেন যে, আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে এই গুরুত্বপূর্ণ মেরামত কর্মসূচি চালু হয়ে যাবে।
মন্তব্য (0)
মন্তব্য নীতিএখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনি করুন।