ভাইরাল ভিডিওর তদন্তে নৈতিক সংযমতার লঙ্ঘন প্রমাণিত হওয়ায় সংসদ সদস্য গাজী নজরুলকে জামায়াত বহিষ্কার করেছে
Administrator
সাতক্ষীরার সংসদ সদস্য গাজী নজরুলকে জামায়াত দল থেকে বহিষ্কার করেছে ভাইরাল ভিডিও এবং নৈতিক অসংযমতার প্রমাণের ভিত্তিতে। তার সংসদ সদস্যপদ বহাল থাকা নিয়ে সংবিধানগত প্রশ্ন উত্থাপিত হয়েছে।
ব্যক্তিগত মুহূর্ত সংবলিত একাধিক ভিডিও সোমবার রাত থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে, যাতে একজন তরুণীর সাথে সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামকে ঘনিষ্ঠভাবে দেখা যায়। ঘটনাটি তিন দিন ধরে সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা তৈরি করে। এর পর জামায়াতে ইসলামী বিষয়টি নিয়ে গভীর অনুসন্ধান শুরু করে।
বুধবার জামায়াতের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের জরুরি সভা হয় রাজধানীর মিন্টো রোডে অবস্থিত বিরোধীদলীয় নেতার সরকারি বাসভবনে। আমির শফিকুর রহমানের সভাপতিত্বে এই বৈঠকে গাজী নজরুলের ক্ষেত্রে দলের অবস্থান নির্ধারণ করা হয়। বৈঠক শেষে দলের কেন্দ্রীয় প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের সেক্রেটারি এহসানুল মাহবুব জুবায়ের একটি বিবৃতি জারি করেন।
এই বিবৃতিতে জানানো হয় যে গাজী নজরুলকে নিয়ে প্রকাশিত সংবাদ সম্পর্কে সাংগঠনিক তদন্ত করা হয়েছে। অনুসন্ধানে তাঁর নৈতিক সংযমতার লঙ্ঘন প্রমাণিত হয়, যার ভিত্তিতে গঠনতন্ত্রের ৬২ নম্বর ধারা প্রয়োগ করে তাঁকে জামায়াত থেকে বহিষ্কার করা হয়। এ সিদ্ধান্ত অবিলম্বে নির্বাচন কমিশনকে জানানোর কথা ঘোষণা করা হয়।
৭৪ বছর বয়সী গাজী নজরুল ইসলাম তিনবার সংসদে নির্বাচিত হয়েছেন। প্রথমবার ১৯৯১ সালে একই আসন থেকে সংসদ সদস্য হয়েছিলেন। জামায়াতে ইসলামীতে তিনি সাতক্ষীরা জেলা শাখার আমির এবং দলের কেন্দ্রীয় মজলিশে শুরার সদস্যের দায়িত্ব পালন করছিলেন।
ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর জামায়াতের খুলনা অঞ্চলের পরিচালক ইজ্জত উল্লাহর নেতৃত্বে একটি অনুসন্ধান কমিটি গঠিত হয়। এই কমিটির অন্য সদস্য হিসেবে ছিলেন সাতক্ষীরা-২ আসনের সংসদ সদস্য মুহাদ্দিস আবদুল খালেক। ইজ্জত উল্লাহ নিজে সাতক্ষীরা-১ আসনের সংসদ সদস্য। মঙ্গলবার সাতক্ষীরায় তদন্ত কমিটির সামনে গাজী নজরুল তাঁর বক্তব্য প্রদান করেন।
কমিটি গাজী নজরুলের প্রথম ও দ্বিতীয় স্ত্রী এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সাক্ষ্য গ্রহণ করে। সম্পূর্ণ পরিস্থিতি জানার জন্য বিভিন্ন প্রশ্ন উত্থাপন করা হয়। তদন্ত প্রতিবেদন কেন্দ্রীয় দলের কাছে জমা দেওয়া হয়। কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ এই প্রতিবেদন বিবেচনা করে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।
তদন্তকারী দল নির্ধারণ করে যে গাজী নজরুল বিয়ের আগে ওই নারীর সাথে একাধিকবার দেখা করেছেন, যা 'পর্দা লঙ্ঘন' হিসেবে বিবেচিত। এছাড়াও ঘটনাটি সংগঠনের সুনাম মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। দলের একজন নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি মন্তব্য করেন যে শুধু সদস্যপদ বাতিল করে এই ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়, তাই বহিষ্কার অপরিহার্য ছিল।
গাজী নজরুলের দ্বিতীয় স্ত্রী তাঁর নিকট আত্মীয়। জামায়াতের একজন দায়িত্বশীল ব্যক্তি জানান যে তিনি যখন ঢাকায় আসেন, সেই আত্মীয়ের বাসায় থাকাকাশি করতেন। গাজী নজরুল নিজে ফেসবুক পোস্টে দাবি করেছেন যে তরুণীটি তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়ম বেগম এবং তাঁরা ১৭ জুন তারিখে প্রথম স্ত্রীর অনুমতিতে পারিবারিকভাবে বিয়ে করেছেন।
তবে জামায়াত ও গাজী নজরুলের পরিবার বলেছে যে ভিডিওগুলি বিয়ের পরের, এবং এই বিয়ে প্রথম স্ত্রীর উপস্থিতিতেই সম্পন্ন হয়েছে। কিছু জামায়াত নেতার মতে, গাজী নজরুল নৈতিক সংযমতা লঙ্ঘনের পাশাপাশি একটি চক্রের ব্ল্যাকমেলের শিকার হয়েছেন বলেও মনে করেন।
গাজী নজরুলের অবস্থান সম্পর্কে আইনি প্রশ্ন দেখা দেয়। সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, যখন কোনো দলের প্রার্থী হিসেবে নির্বাচিত সংসদ সদস্য সেই দল থেকে পদত্যাগ করেন অথবা সংসদে দলের বিপক্ষে ভোট দেন, তখন তাঁর আসন শূন্য হয়ে যায়। কিন্তু দল কোনো সদস্যকে বহিষ্কার করলে তাঁর আসন শূন্য হয় কিনা, এ সম্পর্কে সংবিধানে কোনো স্পষ্ট নির্দেশনা নেই।
সংবিধানের ৬৬ অনুচ্ছেদে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়া ও পদে বহাল থাকার যোগ্যতা ও অযোগ্যতা নির্দিষ্ট করা আছে। এর মধ্যে নৈতিক সংযমতা লঙ্ঘনে দোষী সাব্যস্ত হওয়া একটি কারণ, তবে এটি অবশ্যই ফৌজদারি অপরাধ হতে হবে এবং কমপক্ষে দুই বছরের কারাদণ্ড সাপেক্ষ হতে হবে। শুধু দলের অভ্যন্তরীণ তদন্তের ভিত্তিতে নয়, আদালতে দোষী সাব্যস্ত হওয়া প্রয়োজন।
গাজী নজরুল এখন পর্যন্ত কোনো ফৌজদারি মামলায় দণ্ডিত হননি। তাই দলের অভিযোগ অনুযায়ী সংবিধানের ৬৬ অনুচ্ছেদ তার ক্ষেত্রে প্রয়োগ হয় না। সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ সম্পর্কে বিতর্ক দেখা দিলে এই বিষয়টি নির্বাচন কমিশনের কাছে পাঠানোর বিধান রয়েছে এবং কমিশনের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত বলে গণ্য হয়।
সাবেক নির্বাচন কমিশনার এম সাখাওয়াত হোসেন মনে করেন যে দল থেকে বহিষ্কারের ফলে গাজী নজরুলের সংসদ সদস্যপদও স্বয়ংক্রিয়ভাবে শূন্য হয়ে যাবে। তাঁর যুক্তি হল দলীয় প্রার্থীরা তাদের দলের মনোনীতব্যক্তি হিসেবেই নির্বাচিত হন, এবং বহিষ্কারের পর তারা আর স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য হতে পারেন না। তবে সংবিধানের অস্পষ্টতা এবং পূর্বের রায়ের উপর ভিত্তি করে চূড়ান্ত ফলাফল নির্ভর করবে নির্বাচন কমিশন কী সিদ্ধান্ত নেয় তার উপর।
এদিকে গাজী নজরুল ইসলামসহ পাঁচজনের বিরুদ্ধে রাজধানীর পল্লবী থানায় হত্যাচেষ্টার মামলা করেছেন তাঁর ব্যক্তিগত গাড়ির চালক ওবায়দুর রহমান। গাজী নজরুল ওই তরুণীকে যাকে তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন, ওবায়দুর রহমান সেই ব্যক্তির মামা।
ওবায়দুর রহমান ২১ জুলাই এই মামলা করেন। এতে তিনি অভিযোগ করেন যে সংসদ সদস্যের সাথে যা ঘটেছে সে সম্পর্কে তার প্রতিবাদ এবং একটি ভিডিও প্রকাশে তার সম্পৃক্ততার সন্দেহের কারণে তাকে মারধর করা হয়েছে। গাজী নজরুলের পাশাপাশি চার জন আমিনুর রহমান, মাসুম বিল্লাহ (৪১), মোস্তাসিম বিল্লাহ (২৫) এবং রাকিবুল হাসান (৩০) কে আসামি করা হয়েছে।
পুলিশ আমিনুর রহমানকে গ্রেপ্তার করে এবং তাকে বুধবার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতে উপস্থাপন করা হয়। আদালত তাকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেয় এবং তদন্ত সম্পূর্ণ করে ২৮ আগস্টের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেয়।
মামলার এজাহার অনুযায়ী ওবায়দুর রহমান পল্লবীর কালশী এলাকার 'রোজগার্ডেন টাওয়ার' বহুতলে তার বোনের বাসায় থাকতেন এবং গাজী নজরুলের ব্যক্তিগত গাড়িচালক হিসেবে কাজ করতেন। আত্মীয়তার সূত্রে তিনি ওই বাড়িতে আসা-যাওয়া করতেন। পরবর্তীতে তার ভাগনির সাথে নজরুল ইসলামের অনৈতিক সম্পর্ক গড়ে উঠলে তিনি বিষয়টি পরিবারকে জানান এবং সেই সম্পর্ক ত্যাগ করতে অনুরোধ করেন।
ওবায়দুরের আপত্তিতে ক্ষুব্ধ হয়ে গাজী নজরুল তাকে প্রাণনাশের হুমকি দেন বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়াও তিনি বলেন যে মগবাজারের একটি চক্র সাম্প্রতিক সময়ে গাজী নজরুল এবং সেই তরুণীর কিছু আপত্তিকর ভিডিও সংগ্রহ করে তাকে ব্ল্যাকমেল করছিল। এর থেকে সন্দেহ হয় যে ওবায়দুরই লুকিয়ে ভিডিও রেকর্ড করে মিডিয়া এবং চক্রের কাছে দিয়েছেন।
এই সন্দেহ থেকেই গাজী নজরুল চৌদ্দ জুলাই ওবায়দুরের উপর হামলার নির্দেশ দেন বলে মামলায় বলা হয়েছে। সেদিন দুপুরে আমিনুর রহমান কৌশলে তাকে ড্রয়িংরুমে ডেকে আনেন। সেখানে অন্য আসামিদের সাথে লাঠি দিয়ে তার উপর চরম মারধর করা হয়। একপর্যায়ে আমিনুর তাকে মেঝেতে ফেলে গলা চেপে শ্বাসরোধ করার চেষ্টা করে। পরিবারের চিৎকারে হামলাকারীরা পলায়ন করে এবং ওবায়দুর আহত অবস্থায় কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসা নেয়।
ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পরের দিন সাতক্ষীরার শ্যামনগরে সমাবেশ, প্রতিবাদ মিছিল এবং মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। 'শ্যামনগরের সচেতন নাগরিক সমাজ' ব্যানারে আয়োজিত এই কর্মসূচিতে স্থানীয় বিএনপি এবং তার সহযোগী সংগঠনের নেতা ও জনপ্রতিনিধিরা যুক্ত হন। বক্তারা গাজী নজরুলকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা এবং তার সংসদ সদস্যপদ বাতিল ও বিচারের দাবি জানান। তারা বলেন যে এ ঘটনা শ্যামনগরের সুনাম ক্ষুণ্ণ করেছে।
মন্তব্য (0)
মন্তব্য নীতিএখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনি করুন।