চলন্ত রেলগাড়িতে পাথর ছোড়া: কবে থামবে এই প্রাণঘাতী উন্মাদনা?
Administrator
সিরাজগঞ্জের কামারখন্দে চলমান দ্রুতযান এক্সপ্রেসে পাথর নিক্ষেপে একজন শিক্ষার্থীর চোখের হাড় ভেঙেছে এবং দৃষ্টিশক্তি হারানোর মুখে ফেলেছে। এ ধরনের ঘটনা প্রতি বছর ১৫০ থেকে ২০০ বার ঘটে এবং এটি বাংলাদেশ রেলওয়ের জন্য একটি বিরাট সংকট হয়ে উঠেছে।
সিরাজগঞ্জের কামারখন্দ উপজেলায় পঞ্চগড় থেকে ঢাকাভিমুখী দ্রুতযান এক্সপ্রেস চলার পথে একটি পাথর এসে আঘাত করে একজন শিক্ষার্থীর মুখে। একাদশ শ্রেণির ছাত্র সাব্বির হোসেনের ডান চোখে লাগে সেই পাথরের আঘাত, যা মঙ্গলবার বিকালে চলমান ট্রেন থেকে ছোড়া হয়েছিল।
জামতৈল রেলওয়ে স্টেশনে নামিয়ে প্রাথমিক সেবা দেওয়া হয় সাব্বিরকে। তৎপরে তার চোখের আঘাত নিরীক্ষার জন্য নিয়ে যাওয়া হয় ঢাকার জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে, যেখানে পরীক্ষা-নিরীক্ষায় জানা যায় তার ডান চোখের নিচের হাড়ে ফ্র্যাকচার হয়েছে এবং দৃষ্টিশক্তি ফিরে পাওয়ার সম্ভাবনা নেই।
নাক-কান-গলা বিভাগের চিকিৎসার প্রয়োজনীয়তায় জাতীয় নাক, কান ও গলা ইনস্টিটিউটে স্থানান্তর করা হয় তাকে। সাব্বিরের পিতা দুলাল হোসেন জানান যে অপারেশনের খরচ হবে দেড় লাখ টাকা, যা জোগাড় করতে তারা সংগ্রামে নিয়োজিত।
এমন ঘটনা এখানে সমাপ্ত নয়, বরং সাম্প্রতিক মাসগুলিতে এর পুনরাবৃত্তি বহুবার ঘটেছে। মে মাসের ১৭ তারিখে পারাবত এক্সপ্রেসের এক যাত্রী পাথর আঘাতে আহত হন এবং ভৈরব বাজারের কাছে এক চিকিৎসক পাথর মারার শিকার হয়েছিলেন, যদিও তিনি আরও গুরুতর আঘাত এড়িয়ে যেতে পেরেছিলেন।
এপ্রিল মাসের শেষ দিকে কক্সবাজার এক্সপ্রেসে পাথর নিক্ষেপের ঘটনায় দুই যাত্রী আহত হন—একজনের চার দাঁত ভেঙে যায় এবং অপরজনের ঘাড়ে আঘাত লাগে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শাটল ট্রেনে তৈরি পাথর আঘাতে ট্রেন চালক লোকোমাস্টার মো. ওমর ফারুক মাথায় আঘাত পান।
রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ বা অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানের কাছে এই ধরনের ঘটনার সুসংগত ডেটাবেস নেই, তবে বিভিন্ন উৎস থেকে প্রাপ্ত তথ্য থেকে একটি চিত্র পাওয়া যায়। রেলওয়ে প্রতিবেদনের মতে প্রতি বছর গড়ে ১৫০ থেকে ২০০ টি পাথর নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে, যা এক দশকে ১৫০০ থেকে ২০০০ এর মধ্যে।
২০২৩-২৪ আর্থিক বছরে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলে একাই ১৪৫ টি পাথর নিক্ষেপের ঘটনা রেকর্ড হয়েছে, যাতে ৩৯ জন ব্যক্তি আহত হয়েছেন এবং ট্রেনের দরজা-জানালা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কক্সবাজার রুটেই এই বছর অন্তত ৩৮ টি ঘটনা হয়েছে, যাতে ১৪ জন আহত হয়েছেন। ২০২২ এ সারাদেশে ১১৬ টি ঘটনায় ৩৪ জন, এবং ২০২১ এ ১১০ টি ঘটনায় ২৯ জন আহত হয়েছিলেন।
যাত্রী কল্যাণ সমিতির হিসাব অনুযায়ী গত এক দশকে এই ধরনের ঘটনায় ১০ থেকে ১২ জন মৃত্যুবরণ করেছেন এবং শত শত মানুষ আহত হয়েছেন, তাদের মধ্যে কেউ কেউ স্থায়ী প্রতিবন্ধী হয়েছেন। বাংলাদেশ প্রযুক্তি ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (বুয়েট) এর দুর্ঘটনা গবেষণা কেন্দ্র এই সমস্যার মূল কারণ হিসেবে রেলপথের পাশের ঘনবসতি এবং জনসচেতনার অভাব চিহ্নিত করেছে।
যে সব এলাকায় ঝাড়ঝঙ্গল বেশি এবং যেখানে নির্জন রেলসেতু বা নির্জন অঞ্চল রয়েছে, সেসব স্থান থেকে এই ধরনের ঘটনা বেশি সংঘটিত হয়। দেশব্যাপী প্রায় ২০ টি জেলার নির্দিষ্ট এলাকা পাথর নিক্ষেপের জন্য সর্বোচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ, যেমন ঢাকার তেজগাঁও, গাজীপুরের টঙ্গী ও জয়দেবপুর, কক্সবাজারের রামু, চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড এবং কিশোরগঞ্জের ভৈরব অঞ্চল।
রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক সাঈদুর রহমান জানান যে পাথর নিক্ষেপ বৈশিষ্ট্যগতভাবে কৌতূহল থেকে সংঘটিত হয়, এতে কোনো উদ্দেশ্যমূলক লক্ষ্য বা অর্থনৈতিক উদ্দেশ্য থাকে না।
রেলওয়ের যন্ত্রাংশ বিভাগের হিসাব থেকে জানা যায় যে এই ধরনের ঘটনায় প্রতি বছর ৫০০ থেকে ৬০০ টি ট্রেনের জানালা ভাঙে, যেখানে প্রতিটি উন্নতমানের জানালা প্রতিস্থাপনে ৫ থেকে ১৫ হাজার টাকা খরচ হয়। ২০২২ সালে ১১৬ টি ঘটনায় ১০৯ টি ট্রেনের জানালা এবং ২০২১ সালে ১১০ টি ঘটনায় ১০৩ টি জানালা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
১৮৯০ সালের রেলওয়ে আইনের ১২৬ ও ১২৭ ধারায় এই অপরাধের শাস্তি হিসেবে সর্বোচ্চ ১০ বছর কারাদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড নির্ধারিত রয়েছে। যদি কোনো শিশু বা ১২ বছরের কম বয়সী এই কাজ করে, তবে অভিভাবক দায়ী হন। যদি এই কারণে কেউ মৃত্যুবরণ করেন, তবে দণ্ডবিধির ৩০২ ধারা অনুযায়ী খুনের মামলা হয় এবং মৃত্যুদণ্ড পর্যন্ত সম্ভব, তবে অপরাধী শনাক্ত করা কঠিন হওয়ায় এই অপরাধ প্রবণতা অব্যাহত রয়েছে।
বুয়েটের দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক হাদিউজ্জামান মনে করেন এটি শুধু কৌতূহল নয়, বরং রেলকে অজনপ্রিয় করার সুচিন্তিত প্রচেষ্টা হতে পারে। তিনি ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় নজরদারি বৃদ্ধি, সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন এবং স্থানীয় সম্প্রদায়কে সাথে নিয়ে তদারকি কমিটি গঠনের পরামর্শ দিয়েছেন।
মওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধ ও পুলিশ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মো. ওমর ফারুক পাথর নিক্ষেপ পুনরাবৃত্তির কারণ বিশ্লেষণ করে বলেন যে কিশোর গ্যাং এবং মাদকসংযুক্ত যুবকরা এই কাজ করে এবং সামাজিক অসমতা থেকে উদ্ভূত ক্ষোভের প্রতীকী প্রকাশ এটি। তিনি ট্রেনপথে নিরাপত্তা বাহিনীর উপস্থিতি, সিসিটিভি সার্ভেইল্যান্স এবং স্থানীয় তথ্যপ্রদানকারী নিয়োগের প্রস্তাব করেছেন।
রেলওয়ের পশ্চিমাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক ফরিদ আহমেদ জানান যে তারা ইতিমধ্যে স্কুল-কলেজ ও মসজিদে লিফলেট বিতরণ এবং সচেতনতা কর্মসূচি গ্রহণ করেছেন। ট্রেনপথের পাশের কর্মচারীদের সন্দেহজনক কার্যকলাপ রিপোর্ট করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। চট্টগ্রাম বিভাগের পরিবহন কর্মকর্তা ফারহান মাহমুদ স্বীকার করেন যে বিশেষত রামু সেকশনে এই ঘটনা অনেক বেশি এবং জনবল সংকটে তারা পর্যাপ্ত নিরাপত্তা কর্মী নিয়োগ করতে পারছেন না।
রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. ফাহিমুল ইসলাম সমস্যার মূলে জনসচেতনার অভাব চিহ্নিত করে বলেন যে অনেকে খেলার ছলে এবং কেউ ইচ্ছাকৃত এই কাজ করে থাকেন। জনসচেতনা বৃদ্ধির জন্য তারা পূর্ব অঞ্চলে ক্যাম্পেইন আয়োজন করছেন। সড়ক পরিবহন মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম যুব সমাজের জন্য সচেতনতা বৃদ্ধি এবং স্থানীয় সম্প্রদায়কে সংযুক্ত করার কথা উল্লেখ করেছেন।
মন্তব্য (0)
মন্তব্য নীতিএখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনি করুন।