রবিবার, ১৬ আগস্ট ২০২৬

আমাদের অসতর্কতায় ছড়িয়ে পড়ে হেপাটাইটিস

2 সপ্তাহ আগে | আপডেট: 1 দিন আগে | লাইফস্টাইল

Administrator

আমাদের অসতর্কতায় ছড়িয়ে পড়ে হেপাটাইটিস

অসতর্কতা এবং সাধারণ ভুলের মাধ্যমে হেপাটাইটিসের মতো মারাত্মক ভাইরাস দ্রুত ছড়িয়ে যায়। বিশেষজ্ঞদের সাথে আলোচনায় জানা যায় প্রতিরোধ এবং চিকিৎসার কার্যকর উপায়।

সর্বশেষ সব খবরের জন্য দৈনিক খবর সংযোগের গুগল নিউজ চ্যানেল অনুসরণ করুন।

হেপাটাইটিসের মতো গুরুতর রোগ ছড়িয়ে পড়ে অনেক সময় খুবই সাধারণ ভুলের মাধ্যমে। বিশ্ব হেপাটাইটিস দিবসের প্রসঙ্গে আমাদের সাংবাদিক রাফিয়া আলম কথা বলেছেন বাংলাদেশ হেপাটোলজি সোসাইটির সাধারণ সম্পাদক এবং বারডেম জেনারেল হাসপাতালের লিভার ও গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক মো. গোলাম আযমের সাথে। ২৮ জুলাই এই দিবসটি পালন করা হয়।

দৈনন্দিন জীবনে হেপাটাইটিস সংক্রমণ হওয়ার উপায় কয়েকটি?

ভাইরাসজনিত হেপাটাইটিস বিভিন্ন পথে ছড়িয়ে থাকে। দূষিত রক্ত ও শরীরের অন্যান্য তরলের মাধ্যমে হেপাটাইটিস বি, সি এবং ডি সংক্রমিত হয়। দূষিত খাদ্য ও পানির মাধ্যমে হেপাটাইটিস এ ছড়ায় এবং পানির মাধ্যমে হেপাটাইটিস ই ভাইরাসও প্রবেশ করে। যেসব এলাকায় হেপাটাইটিস বি ভাইরাস ব্যাপক সংক্রামক, সেখানে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দীর্ঘস্থায়ী সংক্রমণ দেখা যায়। এটি প্রসবকালে মা থেকে শিশুতে বা খোলা ক্ষত ও ঘায়ের উপস্থিতিতে সরাসরি সংস্পর্শের মাধ্যমে ছড়ায়। হেপাটাইটিস বি এবং সি-এর সবচেয়ে সাধারণ কারণ হলো অনিরাপদ ইনজেকশন, নিম্নমানের চিকিৎসা ও পরীক্ষা ছাড়াই রক্ত সঞ্চালন। মাদক ব্যবহারকারীদের মধ্যে একই সুচ ও সিরিঞ্জ ভাগাভাগির মাধ্যমে এই ভাইরাস দ্রুত ছড়িয়ে যায়।

নাপিঘর বা সৌন্দর্য সেবা কেন্দ্রে কি হেপাটাইটিস সংক্রমণের ঝুঁকি আছে?

হ্যাঁ, এসব জায়গায় হেপাটাইটিস ছড়ানোর সম্ভাবনা বিদ্যমান। যখন কাঁচি, দাড়ির ক্ষুর এবং লোম অপসারণে ব্যবহৃত ধারালো সরঞ্জাম পরিষ্কার না করে বারবার ব্যবহার করা হয়, তখন ত্বকে ছোট ঘা থাকলেও এক ব্যক্তি থেকে অন্য ব্যক্তিতে হেপাটাইটিস বি এবং সি বিস্তার লাভ করে। অনেক জায়গায় এক দেহ থেকে আরেক দেহে সংক্রমণের ঝুঁকি থাকে যখন এই ধারালো বস্তুগুলি যথাযথভাবে জীবাণুমুক্ত করা হয় না। তাই এসব সেবা নেওয়ার সময় নিশ্চিত করতে হবে যে ব্যবহৃত কাঁচি, ক্ষুর, ব্লেড ও অন্যান্য সরঞ্জাম ডিসপোজেবল অথবা সম্পূর্ণভাবে জীবাণুমুক্ত।

বিবাহের পূর্বে হেপাটাইটিস বি এবং সি পরীক্ষা করানো কি জরুরি?

শুধুমাত্র বিয়ের আগে নয়, যারা টিকা নেননি তাদের সবার জন্যই যত দ্রুত সম্ভব হেপাটাইটিস বি পরীক্ষা করানো উচিত। ফলাফল যদি নেতিবাচক হয়, তাহলে অবশ্যই টিকা গ্রহণ করতে হবে। দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে বিয়ের আগে নিজের পরীক্ষা করিয়ে এই ভাইরাসের উপস্থিতি জেনে নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। যদি পজিটিভ আসে, তাহলে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে ভাইরাসের তীব্রতা বুঝে উপযুক্ত চিকিৎসা নিতে হবে। বিয়ের সময় স্বামী বা স্ত্রীরও পরীক্ষা করিয়ে প্রয়োজনে টিকা দিয়ে দেওয়া উচিত।

হেপাটাইটিস সি-এর বিরুদ্ধে এখনও কোনো প্রতিরোধক টিকা আবিষ্কৃত হয়নি। রক্ত উপাদান ও অঙ্গ প্রতিস্থাপনের ক্ষেত্রে শুধুমাত্র হেপাটাইটিস সি পরীক্ষা প্রয়োজনীয়। কিডনি ডায়ালাইসিস প্রয়োজনীয় রোগীদের চিকিৎসা শুরুর আগে এই ভাইরাসের উপস্থিতি নিশ্চিত করে তারপর যথাযথভাবে যন্ত্র ব্যবহার করতে হবে।

হেপাটাইটিস থেকে কী কী জটিলতা সৃষ্টি হয়?

সকল ধরনের ভাইরাল হেপাটাইটিস তীব্র লিভার প্রদাহ তৈরি করতে পারে। কিন্তু হেপাটাইটিস বি, সি এবং ডি ভাইরাস দীর্ঘমেয়াদী সংক্রমণে রূপান্তরিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। যারা শৈশবে বা পাঁচ বছরের আগে হেপাটাইটিস বি ভাইরাসে আক্রান্ত হন, তাদের প্রায় ৯৫ শতাংশের ক্ষেত্রে এটি দীর্ঘস্থায়ী সংক্রমণে পরিণত হয় যা সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ।

হেপাটাইটিস বি এবং সি ভাইরাস বিশ্বব্যাপী কোটি কোটি মানুষের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী সংক্রমণের কারণ হয়ে আছে। এর পরিণতিতে লিভার সিরোসিস এবং লিভার ক্যান্সার হওয়ার ঝুঁকি থাকে। হেপাটাইটিসের জটিলতায় বিশ্বজুড়ে প্রতি বছর দশ লক্ষের বেশি অকাল মৃত্যু ঘটে, অথচ এই রোগ প্রতিরোধযোগ্য এবং চিকিৎসাযোগ্য।

বৈশ্বিক ভাইরাল হেপাটাইটিসজনিত মোট মৃত্যুর ৯৫ শতাংশেরও বেশি হয় হেপাটাইটিস বি এবং সি-এর কারণে। অবশিষ্ট মৃত্যুর দায়িত্ব হেপাটাইটিস এ, ডি এবং ই ভাইরাস। ২০২৪ সালে বিশ্বব্যাপী আনুমানিক ১১ লক্ষ মানুষ হেপাটাইটিস বি ভাইরাসজনিত লিভার সিরোসিস এবং ক্যান্সারে মারা গেছেন। একই বছরে প্রায় ২ লক্ষ ৪০ হাজার মানুষ হেপাটাইটিস সি ভাইরাসজনিত সিরোসিস এবং লিভার ক্যান্সারে প্রাণ হারিয়েছেন।

চিকিৎসার মাধ্যমে হেপাটাইটিস রোগ সারানো সম্ভব?

১৯৯০ দশক থেকে ৯৫ শতাংশ কার্যকারিতাসম্পন্ন হেপাটাইটিস বি টিকা দীর্ঘস্থায়ী হেপাটাইটিস বি সংক্রমণের বিরুদ্ধে কার্যকর অ্যান্টিভাইরাল চিকিৎসা হিসেবে কাজ করছে। ২০১৫ সাল থেকে হেপাটাইটিস সি-এর জন্য মাত্র ১২ সপ্তাহের অ্যান্টিভাইরাল চিকিৎসা উপলব্ধ হয়েছে, যা প্রায় ৯৫ শতাংশ সাফল্যের হার প্রদান করে।

বিশ্ব হেপাটাইটিস দিবসের তাৎপর্য কী?

বিশ্বব্যাপী রোগী সংস্থা এবং ব্যাপক সচেতনতা প্রচারাভিযানের ফলে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০১০ সালের ওয়ার্ল্ড হেলথ অ্যাসেম্বলিতে একটি সিদ্ধান্ত পাস হয়। হেপাটাইটিস বি-এর আবিষ্কারক অধ্যাপক স্যামুয়েল ব্লুমবার্গ-এর জন্মদিনকে সম্মান করে ২৮ জুলাইকে বিশ্ব হেপাটাইটিস দিবস ঘোষণা করা হয়। তিনি কেবল হেপাটাইটিস বি-র আবিষ্কারকই নন, বরং এর প্রতিষেধক টিকারও উদ্ভাবক, যার জন্য তিনি ১৯৭৬ সালে চিকিৎসা বিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার অর্জন করেন।

বিশ্বজুড়ে হেপাটাইটিস বি এবং সি ভাইরাসের বর্তমান পরিস্থিতি কেমন?

২০২৪ সালে বিশ্বব্যাপী আনুমানিক ২৪ কোটি মানুষ দীর্ঘস্থায়ী হেপাটাইটিস বি ভাইরাসে আক্রান্ত, যা বিশ্বের মোট জনসংখ্যার ২ দশমিক ৯ শতাংশ। তাদের মধ্যে ৫ শতাংশের চেয়ে কম ব্যক্তি চিকিৎসা পাচ্ছেন, অথচ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সর্বশেষ নির্দেশনা (২০২৪) অনুযায়ী প্রায় ৫০ শতাংশ রোগী চিকিৎসার উপযুক্ত।

২০১৫ সাল থেকে চিকিৎসার প্রার্থী মোট ৬ কোটি ৮০ লক্ষ হেপাটাইটিস সি ভাইরাস সংক্রান্ত ব্যক্তির মধ্যে ২০২৪ সালের মধ্যে মাত্র ২০ শতাংশ চিকিৎসা পেয়েছেন। অতিরিক্তভাবে ২০২৪ সালে আনুমানিক ১ কোটি ১০ লক্ষ মানুষ হেপাটাইটিস সি শনাক্ত হওয়ার পরেও এখনো চিকিৎসা শুরু করেননি।

হেপাটাইটিস প্রতিরোধে দীর্ঘমেয়াদী কৌশল কী?

দীর্ঘমেয়াদী সমাধানের জন্য নতুন হেপাটাইটিস বি এবং সি সংক্রমণ প্রতিরোধ করাই সবচেয়ে কার্যকর উপায়। এই পদ্ধতিতেই ২০৩০ সালের সংক্রমণ হার এবং প্রাদুর্ভাব কমানোর বৈশ্বিক লক্ষ্য অর্জন সম্ভব। এছাড়াও মা থেকে শিশুতে হেপাটাইটিস বি সংক্রমণ প্রতিরোধে গর্ভবতী নারীদের জন্য অ্যান্টিভাইরাল প্রতিরোধমূলক চিকিৎসা আরও ব্যাপকভাবে চালু করা প্রয়োজন।

মন্তব্য (0)

মন্তব্য নীতি

এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনি করুন।