শুক্রবার, ১৪ আগস্ট ২০২৬

স্পেনের সীমান্তে আগমন: সেউতায় অভিবাসীদের এক অভূতপূর্ব ঢল এবং এর পেছনের সত্য

2 সপ্তাহ আগে | আপডেট: 43 মিনিট আগে | বিশ্ব

Administrator

স্পেনের সীমান্তে আগমন: সেউতায় অভিবাসীদের এক অভূতপূর্ব ঢল এবং এর পেছনের সত্য

স্পেনের সেউতা শহরে অভূতপূর্ব সংখ্যক অভিবাসী আসার ঘটনা ইউরোপে সংকট তৈরি করেছে। সীমান্ত খোলার সংবাদ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ায় দশ হাজার মানুষ অবৈধভাবে প্রবেশ করে এবং ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলি জরুরি ব্যবস্থার আহ্বান জানায়।

সর্বশেষ সব খবরের জন্য দৈনিক খবর সংযোগের গুগল নিউজ চ্যানেল অনুসরণ করুন।

আফ্রিকা এবং ইউরোপের মধ্যে মাত্র দুটি স্থলসীমান্তের একটি স্পেনের স্বায়ত্তশাসিত শহর সেউতা। এই ক্ষুদ্র ভূখণ্ড—মাত্র ১৮ দশমিক ৫ বর্গকিলোমিটার বিস্তৃত—উত্তর আফ্রিকার মাটিতে অবস্থিত হলেও এটি স্পেনীয় অধিকারভুক্ত। এখানে প্রবেশ মানে ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাজনৈতিক সীমানা অতিক্রম করা। সম্প্রতি এই শহরটিই হয়ে উঠেছে অভিবাসনপ্রত্যাশীদের গন্তব্য, এবং পরিস্থিতি পরিণত হয়েছে সংকটে।

গত কয়েক দিনে অভূতপূর্ব সংখ্যক মানুষ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে স্থল এবং সমুদ্র উভয় পথেই সেউতার দিকে এগিয়েছেন। স্থানীয় প্রশাসকদের বক্তব্য অনুযায়ী, মাত্র ৮০ হাজার বাসিন্দার এই শহরে সাম্প্রতিক সময়ে প্রায় ৬০ হাজার অভিবাসী প্রবেশ করেছেন। সেউতার নেতা জুয়ান জেসুস ভিভাস এই পরিসংখ্যান জানিয়েছেন।

এই আকস্মিক সংকটের আসল কারণ কী? শুক্রবার আন্তর্জাতিক সংবাদসংস্থা এএফপি তার বিশ্লেষণে তুলে ধরেছে এই ঘটনার মূল উৎস। উদ্যোগী অভিবাসীরা শুনেছিলেন যে সেউতার সীমান্ত খুলে দেওয়া হয়েছে—এই সংবাদ ছড়িয়ে পড়েছিল দ্রুত গতিতে। মরক্কোর তাঞ্জিয়ার শহর থেকে একজন নারী অভিবাসী ফাতিমা জাহরা এএফপিকে জানিয়েছেন, 'সকালে ঘুম থেকে উঠেই এমন খবর কানে পড়ল যে স্পেন ও মরক্কোর মধ্যের সীমান্ত খোলা হয়েছে। আমি যারা আমার সাথে ছিল তাদের বলেছি, চলো সেউতায় চলে যাই এবং আমাদের ভাগ্য পরিবর্তনের চেষ্টা করি।'

তার এই উদ্যোগের পেছনে ছিল অর্থনৈতিক সংকট এবং কর্মপরিবেশের ভয়াবহতা। জাহরা বলেছেন, 'এখানকার পরিবেশে অত্যন্ত কঠোর পরিস্থিতিতে কাজ করতে হয়।' কিন্তু তার এই স্বপ্ন অধূরাই থেকে গেল। মরক্কোর নিরাপত্তাবাহিনী তাকে সীমান্তে প্রতিহত করেছে এবং ফিরিয়ে পাঠিয়েছে।

অনুরূপ অভিজ্ঞতা হয়েছে আরেক অভিবাসীর। করিম নামের এই ব্যক্তি বলেছেন যে প্রথমে তিনি শুনেছিলেন কয়েক জন সফলভাবে সেউতায় প্রবেশ করতে পেরেছেন। এই খবরই তাকে উৎসাহিত করেছিল। 'আমি সাহস নিয়ে সীমান্তে গিয়েছিলাম' বলে করিম জানিয়েছেন, 'কিন্তু আমার মতো আরও অনেকে একই খবর শুনে সেখানে জড়ো হয়েছিল।' এই সংবাদের ছড়াছড়ি এতটাই ব্যাপক ছিল যে মারাকেশ এবং কেনিত্রার মতো দূরবর্তী শহর থেকেও মানুষ দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে সীমান্তে এসেছিলেন।

যখন হাজার হাজার মানুষ একসাথে সীমান্তের দিকে এগোতে শুরু করে, তখন সেখানকার নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা সম্পূর্ণভাবে ভেঙে পড়ে। এএফপির মতে, এই বিশাল ঢলের ফলে নিরাপত্তা ব্যবস্থা ক্রমাগত দুর্বল হতে থাকে এবং অভিবাসীরা ক্রমাগত শহরে প্রবেশ করতে সক্ষম হয়। মিডিয়ায় প্রচারিত ভিডিওতে দেখা গেছে, ইউরোপীয় ভূমিতে পৌঁছানোর পর কিছু তরুণ আনন্দে বিজয়-চিহ্ন দেখিয়েছেন এবং চেঁচিয়ে বলেছেন, 'বিদায় মরক্কো, স্বাগতম স্পেন।' এই উদযাপনকারীদের মধ্যে রয়েছেন মাত্র ১৪ বছর বয়সী এক কিশোরীও।

স্পেনের নিরাপত্তাবাহিনী শহরে তেমন একটি শক্তিশালী উপস্থিতি দেখায়নি। কিন্তু বৃহস্পতিবার রাতের পর থেকেই পরিস্থিতি পরিবর্তিত হয়। মরক্কোর পুলিশ বাহিনী সীমান্তে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেছে এবং জমায়েত হওয়া অভিবাসীদের ছিন্ন-ভিন্ন করার জন্য কাঁদানে গ্যাস ও জলকামান ব্যবহার করতে শুরু করেছে। একইসাথে ফনিদেক শহরে সারাদিন বিশৃঙ্খল পরিবেশ বিরাজ করেছিল। হাজার হাজার মানুষ এখানে একত্রিত হয়েছিলেন এবং দলে দলে সীমান্ত ফটকের দিকে ধাবিত হওয়ার চেষ্টা করেছেন। নিরাপত্তাকর্মীদের বাধার মুখে সংঘর্ষও হয়েছে, এবং কয়েকটি গাড়িতেও আগুন লাগানো হয়েছে। রয়টার্স জানিয়েছে যে কমপক্ষে আটটি গাড়িতে আগুন ধরানো হয়েছিল।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের জন্য বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় স্পেনের অভ্যন্তরীণ বিষয় মন্ত্রণালয় সশস্ত্র বাহিনী এবং সিভিল গার্ড বাহিনীর কর্মী মোতায়েনের ঘোষণা দিয়েছে।

সংকটের গভীরতা বোঝার জন্য শুক্রবার স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ সরাসরি সেউতা গিয়েছেন। তার সঙ্গী ছিলেন অভ্যন্তরীণ বিষয় মন্ত্রী ফার্নান্দো গ্রান্দে-মারলাস্কা। পরিস্থিতিকে 'অপ্রত্যাশিত' বলে অভিহিত করে সানচেজ বলেছেন, 'আমরা নিশ্চিত করব যে সেউতার নিরাপত্তা রক্ষা করা হবে ঠিক মাদ্রিদের নিরাপত্তা রক্ষার মতোই।'

সানচেজ উল্লেখ করেছেন যে গত বছর স্পেনে অবৈধ অভিবাসন প্রায় ৪০ শতাংশ হ্রাস পেয়েছিল। তাই বর্তমানের এই অভূতপূর্ব বৃদ্ধি আগেকার প্রবণতার সম্পূর্ণ বিপরীত। অভিবাসনপ্রত্যাশীদের মরক্কোতে ফেরত পাঠানোর সময়সীমা নিয়ে প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেছেন, 'যত তাড়াতাড়ি সম্ভব।' তিনি আরও জানিয়েছেন যে মরক্কোর সাথে আলোচনা করা হয়েছে এবং মরক্কো অভিবাসীদের ফেরত নেওয়ার প্রক্রিয়ায় সহযোগিতা করতে সম্মত হয়েছে। প্রয়োজন অনুযায়ী এই বিষয়ে আইনের পরিবর্তনও আনা যেতে পারে বলে তিনি ইঙ্গিত করেছেন।

এই ঘটনার পর সমগ্র ইউরোপজুড়ে উদ্বেগের ঢেউ বয়ে গেছে এবং বিভিন্ন দেশের মধ্যে মতবিরোধও সৃষ্টি হয়েছে। ইউরোপীয় কমিশনের নেতৃত্বে রয়েছেন উরসুলা ফন ডার লিয়েন, তিনি সোশ্যাল মিডিয়ায় জানিয়েছেন যে ইউরোপীয় ইউনিয়ন মরক্কোর সাথে এই বিষয়ে যোগাযোগ করছে।

ফ্রান্সের দিক থেকে স্পেনের সীমান্তে নিরীক্ষণ কার্যক্রম আরও কঠোর করা হয়েছে। ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ বলেছেন যে ইউরোপীয় সীমান্ত ও উপকূলরক্ষী সংস্থা ফ্রন্টেক্সের মাধ্যমে স্পেনকে সহায়তার জন্য ফ্রান্স প্রস্তুত। অন্যদিকে ইতালি এবং ডেনমার্ক আরও কঠোর অবস্থান নিয়েছে। তারা হুমকি দিয়েছে যে যদি পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে না আসে তবে ইউরোপীয় ইউনিয়নের অভ্যন্তরীণ খোলা সীমান্ত ব্যবস্থা (শেনজেন চুক্তি) থেকে স্পেনকে সাময়িকভাবে বাদ দেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এই উভয় দেশই জরুরি ভিত্তিতে ইউরোপীয় নেতাদের সম্মেলনের আহ্বান জানিয়েছে।

বিশ্লেষণের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক রয়টার্স তুলে এনেছে। চলমান মাসের শুরুতে স্পেনের সর্বোচ্চ আদালত একটি রায় প্রদান করেছিল। সেই রায়ে বলা হয়েছিল যে সমুদ্রে ধরা অভিবাসনপ্রত্যাশীদের কোনো আইনি প্রক্রিয়াবিহীনভাবে সরাসরি সেউতা বা মেলিয়ার সীমান্তের মাধ্যমে ফেরত পাঠানো যাবে না। রয়টার্স এই রায়কেও বর্তমান সংকটের একটি প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে।

উত্তর আফ্রিকার মাটিতে অবস্থিত সেউতা এবং মেলিয়া স্পেনের দুটি স্বায়ত্তশাসিত শহর। এই দুই শহরকে ঘিরেই আফ্রিকা এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের একমাত্র স্থলসীমান্ত গড়ে উঠেছে। দীর্ঘদিন ধরে অভিবাসনপ্রত্যাশীদের কাছে এই দুই শহর ছিল ইউরোপে প্রবেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ দ্বার।

মন্তব্য (0)

মন্তব্য নীতি

এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনি করুন।