শিল্প খাতের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত: জ্বালানি সংকটে নীতি সংলাপে বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ
Administrator
গ্যাস ও বিদ্যুতের দীর্ঘমেয়াদী সংকট দেশের শিল্প খাতকে গভীর সংকটে ফেলেছে, যা উৎপাদন খরচ বাড়াচ্ছে এবং বিদেশি বিনিয়োগ রোধ করছে।
রাজধানীর একটি প্রখ্যাত পাঁচ তারকা হোটেলে দৈনিক বণিক বার্তা আয়োজিত 'বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ও রূপান্তর' শীর্ষক নীতি সংলাপে দেশের শিল্পোদ্যোক্তা, ব্যবসায়ী, জ্বালানি বিশেষজ্ঞ, নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও সরকারি কর্মকর্তারা শিল্প খাতের সামনে আসা গুরুতর জ্বালানি সংকট নিয়ে গভীর আলোচনা করেছেন।
গ্যাসের তীব্র ঘাটতি এবং বিদ্যুৎ বিতরণে নিয়মিত বিচ্ছিন্নতা শিল্প উৎপাদন চক্রকে প্রতিদিন ব্যাহত করছে, যার ফলে প্রতিষ্ঠানগুলোর উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানি পণ্যের প্রতিযোগিতামূলকতা ক্রমাগত হ্রাস পাচ্ছে। অনিশ্চিত জ্বালানি সরবরাহের কারণে নতুন শিল্প স্থাপন এবং বৈদেশিক বিনিয়োগ প্রকল্পগুলোও অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে আছে।
শিল্প নেতারা দৃঢ়তার সাথে জানিয়েছেন যে স্থিতিশীল ও নির্ভরযোগ্য জ্বালানি সরবরাহের নিশ্চয়তা ছাড়া কোনো বিনিয়োগকারী দীর্ঘমেয়াদী উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ করতে পারবেন না। ইস্ট কোস্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান আজম জে চৌধুরী বলেছেন যে নীতির স্বচ্ছতা ও পূর্বাভাসযোগ্যতার অভাবে শিল্প উৎপাদন ও সরবরাহ শৃঙ্খল গভীরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, এবং তিনি সৌর শক্তি খাতের শুল্কনীতিতে অসামঞ্জস্য রয়েছে বলে অভিযোগ তুলেছেন।
মেঘনা গ্রুপের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোস্তফা কামাল বিশ্বাস করেন যে বিলম্ব না করে দেশীয় কয়লার খনিজ সম্পদ উত্তোলনে অগ্রসর হওয়া উচিত। নিজস্ব কয়লা কাজে লাগানো গেলে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় নিয়ন্ত্রণে থাকবে এবং বৈদেশিক মুদ্রার চাপ হ্রাস পাবে। একই সাথে তিনি স্থলভাগ ও সমুদ্র সীমায় খনিজ সম্পদ অনুসন্ধানে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য আহ্বান জানিয়েছেন।
ট্রান্সকম গ্রুপের সিইও সিমিন রহমান বলেছেন যে শিল্যের প্রকৃত সমস্যা গ্যাসের অভাবের চেয়ে নিরন্তর ও উচ্চমানের বিদ্যুৎ সরবরাহের নিশ্চয়তা পাওয়া যায় না। ভোল্টেজের ওঠানামা ও আকস্মিক বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্নতায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। বিশেষ করে ওষুধ শিল্পে মাত্র কয়েক মিনিটের বিদ্যুৎ বিভ্রাটে লক্ষ লক্ষ টাকার উৎপাদিত পণ্য নষ্ট হয়ে যেতে পারে। ফলে শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো অতিরিক্ত বিনিয়োগ করে জেনারেটর ও ব্যাকআপ বিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন করছে, কিন্তু আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার কারণে এই খরচ পণ্যের মূল্যে যোগ করা সম্ভব হয় না।
আন্তর্জাতিক বাণিজ্য কক্ষের সভাপতি মাহবুবুর রহমান জানিয়েছেন যে জ্বালানি সরবরাহে নিশ্চয়তা ছাড়া কোনো নতুন বৈদেশিক বিনিয়োগ আসবে না। আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীরা স্থানীয় উদ্যোক্তাদের ব্যবসায়িক পরিবেশ পর্যবেক্ষণ করেন এবং যদি বিদ্যমান শিল্পই গ্যাস সংকটে দুর্বল থাকে তাহলে নতুন প্রকল্পে আগ্রহী হবেন না। তিনি নবায়নযোগ্য শক্তির বড় প্রকল্প বাস্তবায়নে দ্রুত সরকারি ভূমি বরাদ্দের দাবি রেখেছেন।
ওয়ালটন হাই-টেক ইন্ডাস্ট্রিজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এসএম মাহবুবুল আলম বলেছেন যে শিল্প খাতে সবুজ ও পুনর্নবীকরণযোগ্য শক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি করলে জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিডের উপর চাপ কমবে। তার প্রতিষ্ঠান বর্তমানে নিজস্ব কারখানায় ২২ মেগাওয়াট সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদন করছে এবং একটি ৫০ মেগাওয়াট প্রকল্প বাস্তবায়নাধীন।
ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আহসান জামান চৌধুরী সতর্ক করেছেন যে গ্যাস সংকটের কারণে তার ব্যাংকের সাত থেকে আট হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ আটকে আছে। অনেক উদ্যোক্তা গ্যাস সংযোগের অনুমোদন পেয়ে কারখানা নির্মাণ করেছেন কিন্তু পরে গ্যাস সরবরাহ না পাওয়ায় উৎপাদন শুরু করতে পারছেন না এবং আমদানিকৃত যন্ত্রপাতি নষ্ট হচ্ছে। এই প্রতিষ্ঠানগুলো যদি ঋণ খেলাপি হয় তাহলে সম্পূর্ণ ব্যাংকিং খাত ঝুঁকিগ্রস্ত হবে।
সিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসরুর আরেফিন বিশ্বাস করেন যে এলএনজি আমদানির উৎস বৈচিত্র্যময় করা, স্থলভিত্তিক এলএনজি টার্মিনাল স্থাপন, গ্যাস অনুসন্ধান সম্প্রসারণ এবং বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই। স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড বাংলাদেশের ভারপ্রাপ্ত প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. এনামুল হক জানিয়েছেন যে নীতিগত ধারাবাহিকতা ও দীর্ঘমেয়াদী অর্থায়ন নিশ্চিত করলে নবায়নযোগ্য শক্তি ও অবকাঠামো খাতে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি পাবে।
ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের উপাচার্য অধ্যাপক এম. তামিম মনে করেন যে দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে উদাসীনতা বিরাজ করছিল। এখন অত্যাধুনিক প্রযুক্তি প্রয়োগ করে স্থলীয় ও সামুদ্রিক উভয় ক্ষেত্রেই অনুসন্ধান তৎপরতা বাড়াতে হবে। একই সাথে কয়লার ব্যবহার বৃদ্ধি করে গ্যাসের উপর নির্ভরশীলতা কমানোর সুপারিশ করেছেন।
বাংলাদেশ শক্তি নিয়ন্ত্রক কমিশনের চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ জানিয়েছেন যে স্থানীয় গ্যাস উৎপাদন ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ২ হাজার ৬৭০ মিলিয়ন ঘনফুট ছিল যা বর্তমানে মাত্র ১ হাজার ৭০০ মিলিয়ন ঘনফুটে নেমে এসেছে। এই হ্রাসমান উৎপাদন মোকাবেলায় অনুসন্ধান জোরদার করার সাথে সাথে উচ্চ খরচের বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো ধাপে ধাপে অবসায়নের পরিকল্পনা প্রয়োজন।
পেট্রোবাংলার পরিচালক মো. শোয়েব জানিয়েছেন যে দেশীয় গ্যাস আহরণ বৃদ্ধির লক্ষ্যে একশত নতুন কূপ খোদাই করার পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। একই সাথে ৫০টি বিদ্যমান কূপে গভীর অনুসন্ধান ও খনন কাজ চলমান রয়েছে। সমুদ্র সীমায় বিডিং প্রক্রিয়ায় আন্তর্জাতিক তেল কোম্পানিগুলোর পক্ষ থেকেও ইতিবাচক সাড়া পাওয়া যাচ্ছে।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ জানিয়েছেন যে বিদ্যুৎ বিতরণ খাতে নিয়োজিত ছয়টি সংস্থাকে ধাপে ধাপে বেসরকারি খাতে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এতে নীতিগত সম্মতি প্রদান করেছেন। সরকার বিদ্যুৎ উৎপাদন ও পাইকারি সরবরাহ বজায় রাখবে যখন বেসরকারি খাত বিতরণ পরিচালনা করবে, যা সেবার গুণমান, জবাবদিহিতা ও বিল সংগ্রহ উন্নত করবে।
মন্ত্রী জানিয়েছেন যে ২৮ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা গড়ে তোলা হয়েছে কিন্তু প্রয়োজনীয় গ্যাসের সরবরাহ নিশ্চিত করা হয়নি। খুলনায় নির্মিত গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র ভোলা-বরিশাল-খুলনা পাইপলাইনের অনুপস্থিতিতে প্রায় নিষ্ক্রিয় অবস্থায় রয়েছে। দীর্ঘমেয়াদে গ্যাস অনুসন্ধানে কার্যকর উদ্যোগের অভাব দেশকে আমদানিনির্ভর করে তুলেছে।
দেশে বর্তমানে দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল কাজ করছে যার একটিতে সম্প্রতি অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে যা গ্যাস সরবরাহে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করেছে। এর ফলে ময়মনসিংহসহ বিভিন্ন এলাকায় গ্যাস চাপ হ্রাস পেয়েছে এবং সিএনজি স্টেশন ও আবাসিক সরবরাহ ব্যাহত হয়েছে, এমনকি কোথাও সাধারণ মানুষ সড়ক অবরোধ করেছেন।
মন্ত্রী জানিয়েছেন যে আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির অত্যধিক উচ্চ মূল্য এবং পূর্ববর্তী সরকারের রেখে যাওয়া প্রায় সাতষট্টি হাজার কোটি টাকার বকেয়া বিল বর্তমান সরকারের উপর বিশাল চাপ সৃষ্টি করছে। এই পরিস্থিতি সমাধানে অর্থ মন্ত্রণালয়ের একটি বিশেষ কমিটি কাজ করছে।
বর্তমান সরকারের মেয়াদে দশ হাজার মেগাওয়াট সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদনের উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে বলে মন্ত্রী জানিয়েছেন। ক্লাস্টারভিত্তিক ছাদ সৌর প্যানেল স্থাপন এবং সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী উদ্যোক্তাদের জন্য কর সুবিধা প্রদানের পরিকল্পনা চলছে। আগস্ট বা সেপ্টেম্বরের মধ্যে বৃহৎ সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের দরপত্র আহ্বান করার সম্ভাবনা রয়েছে।
মন্তব্য (0)
মন্তব্য নীতিএখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনি করুন।