দুইশ বছরের ঐতিহ্য রক্ষায় প্রতীকী নৌকা বাইচ: সংকটের মুখে ফরিদপুরের লোকসংস্কৃতি
পানির তীব্র সংকটের কারণে ফরিদপুরের খেজুরতলায় এবার নৌকা বাইচ প্রতিযোগিতামূলক না হলেও, দুইশ বছরের ঐতিহ্যকে ধরে রাখতে প্রতীকী আয়োজনে মেতেছে স্থানীয় জনপদ।
ঐতিহ্যের টানে প্রতিকূলতাকে জয়
ফরিদপুরের সদরপুর উপজেলার খেজুরতলা খালের বুকজুড়ে এখন আর জলতরঙ্গ নেই, নেই প্রতিযোগিতার সেই চিরচেনা উত্তেজনার ঢেউ। তবুও প্রায় দুইশ বছরের পুরনো লোকজ ঐতিহ্যকে বিলুপ্তির হাত থেকে বাঁচাতে স্থানীয়রা গ্রহণ করেছেন এক ব্যতিক্রমী পথ। পানির চরম সংকটের কারণে এবার একাধিক নৌকার লড়াই সম্ভব না হলেও, প্রতীকীভাবে একটি মাত্র নৌকা নিয়ে আয়োজিত হয়েছে ঐতিহ্যবাহী নৌকা বাইচ। এই আয়োজন প্রমাণ করে, সংস্কৃতি যখন মানুষের আবেগের সাথে মিশে থাকে, তখন প্রতিকূলতাও তাকে পুরোপুরি স্তব্ধ করতে পারে না।
ইতিহাসের আয়নায় খেজুরতলা
জনশ্রুতি রয়েছে, প্রায় দুই শতাব্দী ধরে প্রতিবছর ভাদ্র মাসের শুরুতে খেজুরতলা খালে এই নৌকা বাইচ অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। এক সময় এই উৎসবকে কেন্দ্র করে পুরো অঞ্চলটি পরিণত হতো জনসমুদ্রে। দূর-দূরান্ত থেকে নামি-দামি সব নৌকার বহর নিয়ে আসতেন মাঝিরা। বৈঠার তাল, ভাটিয়ালি সুর আর দর্শকদের আকাশচুম্বী হুঙ্কারে মুখরিত থাকতো খালপাড়। এটি কেবল একটি খেলা ছিল না, বরং ছিল গ্রামীণ জনপদের সামাজিক মেলবন্ধনের এক মহোৎসব। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তন এবং খালের নাব্যতা হ্রাসের ফলে সেই জৌলুস আজ ম্লান হতে বসেছে।
উৎসবের আমেজ ও জনসম্পৃক্ততা
প্রতিযোগিতামূলক বাইচ না হলেও, স্থানীয়দের আগ্রহে বিন্দুমাত্র ভাটা পড়েনি। প্রায় ৫০০ মিটার এলাকা জুড়ে নারী-পুরুষ, শিশু-কিশোরের উপচে পড়া ভিড় যেন এক অন্যরকম উৎসবের বার্তা দেয়। নৌকা বাইচকে কেন্দ্র করে খালের দুই পাড়ে বসেছিল অস্থায়ী মেলা। চটপটি, মিষ্টি, খেলনা ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের পসরা সাজিয়ে বসেছিলেন ব্যবসায়ীরা। এটি প্রমাণ করে, স্থানীয় অর্থনীতি ও সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে এই নৌকা বাইচ আজও কতটা প্রাসঙ্গিক।
ভবিষ্যৎ সংকট ও আমাদের করণীয়
আয়োজক কমিটির সভাপতি ও চরবিষ্ণুপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. মোয়াজ্জেম হোসেনের মতে, খালে পানির অভাবে এবারের আয়োজনটি ছিল কেবলই একটি প্রতীকী প্রচেষ্টা। তবে এই উদ্যোগের মাধ্যমে তারা ভবিষ্যতের জন্য একটি ইতিবাচক বার্তা রাখতে চেয়েছেন। বিশ্লেষকদের মতে, নদীমাতৃক বাংলাদেশের এই ঐতিহ্যগুলোকে টিকিয়ে রাখতে হলে কেবল আবেগের ওপর নির্ভর করলে চলবে না; প্রয়োজন খালের খনন এবং জলাধার সংরক্ষণের মতো টেকসই পদক্ষেপ। আগামী প্রজন্মের জন্য এই ঐহিত্যকে পূর্ণাঙ্গরূপে ফিরিয়ে আনাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
মন্তব্য (0)
মন্তব্য নীতিএখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনি করুন।