বৃষ্টিহীন শ্রাবণ: দিনাজপুরের ফুলবাড়ীতে আমন চাষে সেচের বাড়তি খরচে দিশেহারা প্রান্তিক কৃষক
দিনাজপুরের ফুলবাড়ীতে দীর্ঘ এক মাস বৃষ্টির দেখা নেই। অনাবৃষ্টির কারণে আমন চাষে সেচের বাড়তি খরচ জোগাতে হিমশিম খাচ্ছেন কৃষকরা। ফসল রক্ষায় শ্যালো মেশিন ও গভীর নলকূপের ওপর নির্ভর করতে গিয়ে উৎপাদন ব্যয় নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন তারা।
অনাবৃষ্টির কবলে ফুলবাড়ীর আমন মৌসুম
ঋতুচক্রের নিয়মে শ্রাবণের আকাশ মেঘে ঢাকা থাকার কথা থাকলেও দিনাজপুরের ফুলবাড়ীতে চিত্রটা একেবারেই ভিন্ন। ভরা বর্ষায় বৃষ্টির দেখা নেই প্রায় এক মাস ধরে। প্রখর রোদ আর অনাবৃষ্টিতে উপজেলার বিস্তীর্ণ আমন খেতের মাটি ফেটে চৌচির হয়ে যাচ্ছে। প্রকৃতির এই বিরূপ আচরণে আমন চাষের ভরা মৌসুমে চরম সংকটে পড়েছেন স্থানীয় কৃষকরা। উঁচু জমির আমন চারাগুলো পানির অভাবে বিবর্ণ হয়ে মরতে বসেছে, যা নিয়ে দুশ্চিন্তার ভাঁজ পড়েছে কৃষকের কপালে।
সেচ খরচ: কৃষকের লাভের পথে বড় বাধা
প্রকৃতির ওপর নির্ভর করে যে আমন চাষ, তা এখন পুরোপুরি যান্ত্রিক সেচের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। কৃষকদের অভিযোগ, ডিজেলের উচ্চমূল্য এবং শ্রমিকের মজুরি বৃদ্ধির কারণে সেচ দেওয়া এখন তাদের জন্য গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফুলবাড়ীর কৃষক মদন চন্দ্র রায় জানান, ছয় বিঘা জমিতে ধান চাষ করে তিনি এখন সেচ খরচ মেটাতে হিমশিম খাচ্ছেন। ডিজেলচালিত শ্যালো মেশিন বা গভীর নলকূপ দিয়ে পানি সরবরাহ করতে গিয়ে যে বাড়তি ব্যয় হচ্ছে, তা ফসলের কাঙ্ক্ষিত লাভের স্বপ্নকে ধূলিসাৎ করে দিচ্ছে। সমবায় সমিতির মাধ্যমে গভীর নলকূপ চালু করা হলেও তা উৎপাদন খরচের বোঝা কমাতে পারছে না।
উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ও কৃষি প্রশাসনের ভূমিকা
উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, এবার ফুলবাড়ীতে প্রায় ১৮ হাজার ১৯০ হেক্টর জমিতে আমন আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। তবে দীর্ঘস্থায়ী খরা এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কৃষি কর্মকর্তা সাইফ আব্দুল্লাহ জানান, মাঠপর্যায়ে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে এবং বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের সহায়তায় সেচ সুবিধা নিশ্চিত করার চেষ্টা চলছে। তবে আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাস বলছে, সহসাই ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা কম, যা কৃষকদের উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
ভবিষ্যৎ সংকট ও করণীয়
ফুলবাড়ী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আহমেদ হাছান জানিয়েছেন, খরা মোকাবিলায় সেচ কমিটি সক্রিয় রয়েছে এবং প্রয়োজনে নলকূপের সংখ্যা বাড়ানো হবে। কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যায়, জলবায়ু পরিবর্তনের এই অভিঘাত কি কেবল সেচ দিয়ে সামাল দেওয়া সম্ভব? বৃষ্টির অনিশ্চয়তা এবং ক্রমবর্ধমান উৎপাদন খরচ যদি অব্যাহত থাকে, তবে আগামীতে আমন চাষে কৃষকদের অনীহা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। কৃষি অর্থনীতিকে টেকসই করতে এখন কেবল সেচ নয়, বরং খরা সহনশীল জাতের ধান চাষ এবং আধুনিক পানি সাশ্রয়ী প্রযুক্তির দিকে নজর দেওয়া সময়ের দাবি।
মন্তব্য (0)
মন্তব্য নীতিএখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনি করুন।