শনিবার, ১৫ আগস্ট ২০২৬

অসংখ্য ক্ষতির সম্মুখীন হয়েও মোস্তাফিজুরের বিসিএস বিজয়: ৪৭তম ব্যাচে শিক্ষা ক্যাডারে স্থান

2 সপ্তাহ আগে | আপডেট: 1 সপ্তাহ আগে | জাতীয়

Administrator

অসংখ্য ক্ষতির সম্মুখীন হয়েও মোস্তাফিজুরের বিসিএস বিজয়: ৪৭তম ব্যাচে শিক্ষা ক্যাডারে স্থান

পরিবারের সব সদস্য হারিয়ে দশ লাখ টাকা ঋণের চাপে মোস্তাফিজুর রহমান কীভাবে বিসিএস পরীক্ষায় সফল হলেন—এটি একটি অসাধারণ জীবনসংগ্রামের গল্প যা হতাশার মধ্যে আলো জ্বালায়।

সর্বশেষ সব খবরের জন্য দৈনিক খবর সংযোগের গুগল নিউজ চ্যানেল অনুসরণ করুন।

মোস্তাফিজুর রহমান ৪৭তম বিসিএস পরীক্ষায় শিক্ষা ক্যাডারে সুপারিশ পেয়েছেন। কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারী উপজেলায় অবস্থিত পাথরডুবি গ্রামের এই সন্তান রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সমাজকর্মে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শিক্ষায় উত্তীর্ণ। তবে তাঁর এই সাফল্যের পথ ছিল অত্যন্ত কণ্টকময় এবং দুর্বহ।

পরিবারের মধ্যে ধারাবাহিকভাবে বড় দুটো ক্ষতির সম্মুখীন হন মোস্তাফিজুর। প্রথমে হারিয়েছেন পিতাকে, পরে বড় ভাইকে। এসব দুর্ঘটনার পাশাপাশি পরিবারের কাঁধে ছিল প্রায় দশ লাখ টাকার ঋণের চাপ। এই সমস্ত বিষয় সামলিয়ে তিনি বিসিএস পরীক্ষার প্রস্তুতি নিয়েছেন এবং পরপর দুইবার ব্যর্থ হয়েও তৃতীয় প্রচেষ্টায় সফল হন।

মোস্তাফিজুরের বড় ভাই মুকুল ২০১০ সালে মালদ্বীপে কাজের উদ্দেশ্যে যান স্বপ্ন নিয়ে। সেখান থেকে উপার্জনের টাকা দেশে পাঠাতেন তিনি, যা বাবা মাছ চাষের ব্যবসায় বিনিয়োগ করেছিলেন। পাঁচ বছরের চুক্তিতে একটি বিশাল পুকুর ইজারা নেওয়া হয় এবং মোস্তাফিজুর বিদ্যালয়ের পর বাবার সব কাজ দেখাশোনা করে। রাত্রিকালে সেই নির্জন পুকুরের পাহারা দেওয়া তাঁর দায়িত্ব ছিল।

দুর্ভাগ্যবশত, পরপর বন্যার কারণে পুকুরের সমস্ত মাছ বিনষ্ট হয়ে যায়। এর সাথে সাথে পরিবারের স্বপ্নও বিলীন হয়ে যায়। দীর্ঘ প্রবাসকাল শেষে ২০১৭ সালে মুকুল দেশে প্রত্যাবর্তন করেন, কিন্তু তখন তার হাতেও কিছু ছিল না। সঞ্চয় সম্পূর্ণ শেষ হয়ে গিয়েছিল এবং শেষ পর্যন্ত মুকুলকেও বাবার পেশায় যুক্ত হতে বাধ্য করা হয়।

এহেন দুর্ভোগের মাঝেও মোস্তাফিজুর রহমান রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পান। পরিবার সবকিছু হারিয়েছে তবুও তার বাবা সকলের কাছে গর্বের সাথে বলতেন যে তার ছেলে একদিন অবশ্যই বিসিএস ক্যাডার হবে।

পরিবার যখন ধীরে ধীরে স্থিতিশীলতার দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল, তখনই নতুন দুর্যোগ আসে। বাবার লিভার ক্যান্সার রোগ নির্ণিত হয়। বাবাকে বাঁচানোর জন্য মোস্তাফিজুর এবং মুকুল নিরলসভাবে চেষ্টা করেন। চিকিৎসার জন্য প্রচুর অর্থের প্রয়োজন ছিল এবং তারা সবকিছু বিক্রি করেও বড় পরিমাণ ঋণ নেন। সব প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়ে ২০২০ সালের ২৩ মে তাদের বাবা মৃত্যুবরণ করেন।

২০২৪ সালে মোস্তাফিজুর তার মাস্টার্স ডিগ্রি সম্পন্ন করেন। এই সময়ে তিনি টিউটরিং করে আয় করছিলেন এবং সাথে সাথে বিসিএস পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। দুবার বিসিএস পরীক্ষায় ব্যর্থ হওয়ার পর তৃতীয়বার সবাইকে ধাক্কা দিয়ে পুনরায় পড়তে শুরু করেন। কিন্তু তার জন্য আরও একটি বড় সংকট অপেক্ষা করছিল।

প্রাথমিক পরীক্ষার মাত্র এক মাস আগে, ঠিক যখন তিনি পড়াশোনায় সম্পূর্ণভাবে নিয়োজিত ছিলেন, তখনই তার বড় ভাই মুকুল স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। বাবা ও ভাই—উভয়ই চলে গেছেন, আর পরিবারের মেরুদণ্ড হিসেবে দাঁড়ানোর কেউ নেই।

মোস্তাফিজুরের জন্য আর হারানোর কিছু ছিল না; পরিবার ও ঋণের দায়িত্ব ছিল মাত্র অবশিষ্ট। পাওনাদারের তাগাদা, মায়ের অঝোর কান্না, ভাবির অনিশ্চয়তায় ভরা চোখ এবং ছোট ভাইয়ের অসহায়ত্ব—এসব কিছু সামলিয়ে পড়াশোনার দিকে মনোনিবেশ করেন তিনি। তিনি সবকিছু পাশে সরিয়ে রেখে কেবল পরীক্ষার প্রস্তুতিতে ফোকাস করেন।

এই অটুট মনোযোগ এবং নিষ্ঠাই তাকে বিসিএসে সফল করে তোলে। মোস্তাফিজুর বলছিলেন যে, যদি তার বাবা এবং ভাই জীবিত থাকতেন তাহলে তারা তার চেয়ে আরও বেশি খুশি হতেন।

পাথরডুবি উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধানশিক্ষক আবুল কাশেম একই গ্রামে বাস করেন এবং মোস্তাফিজুরের বাবার সহযোগী ছিলেন। তিনি বলছেন যে এই তরুণ অত্যন্ত কঠিন পরিস্থিতিতে বেড়ে উঠেছে এবং তার বাবাও অনেক কষ্ট-কাঠিন্য সহ্য করেছেন। অর্থাভাবের কারণে বাবা এসএসসি পরীক্ষায় শুধু অংশগ্রহণ করেছিলেন কিন্তু চূড়ান্ত পরীক্ষায় অংশ নিতে পারেননি। বড় ভাই মুকুল অষ্টম শ্রেণীর পরেই স্কুল ছেড়ে দিয়েছিলেন। এরূপ একটি পরিবার থেকে বিসিএস সুপারিশপ্রাপ্ত হওয়া সত্যিই অসাধারণ এবং তাদের জন্য একটি বিশাল সুযোগ।

মন্তব্য (0)

মন্তব্য নীতি

এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনি করুন।