শুক্রবার, ১৪ আগস্ট ২০২৬

নেত্রকোণার পাহাড়ি ঢলে কলমাকান্দা জর্জরিত, গজারমারী বিদ্যালয় নদীগর্ভে

3 সপ্তাহ আগে | আপডেট: 1 সপ্তাহ আগে | সারাদেশ

Administrator

নেত্রকোণার পাহাড়ি ঢলে কলমাকান্দা জর্জরিত, গজারমারী বিদ্যালয় নদীগর্ভে

মেঘালয়ের অবিরাম বৃষ্টিপাত সৃষ্ট পাহাড়ি ঢলে কলমাকান্দায় এক অভূতপূর্ব দুর্যোগ নেমে এসেছে। একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় নদীগর্ভে, ৫০ একর কৃষিজমি বালুচাপায় সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত এবং রাস্তা ধসে গণপরিবহন বন্ধ হয়ে গেছে।

সর্বশেষ সব খবরের জন্য দৈনিক খবর সংযোগের গুগল নিউজ চ্যানেল অনুসরণ করুন।

সোমবার ভোরবেলা কলমাকান্দার সীমান্তবর্তী জনপদ জেগে উঠেছে এক ভয়ংকর বাস্তবতায়—মেঘালয়ের অবিরাম বৃষ্টিপাত থেকে সৃষ্ট পাহাড়ি স্রোত খারনৈ, নাজিরপুর, রংছাতি এবং লেংগুরা ইউনিয়নে প্রবল বেগে ছুটে এসেছে। এই অতি দ্রুত প্রবাহমান পানি গজারমারী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অফিস কক্ষ ও একটি শ্রেণিকক্ষ মুহূর্তের মধ্যে চেংনী নদীর গভীরে নিমজ্জিত করেছে। শিক্ষার্থীদের আসন, বই-পত্র এবং গুরুত্বপূর্ণ রেকর্ড সবকিছুই নদীর আঘ্রাসে হারিয়ে গেছে।

শুধু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ক্ষতি নয়, যোগাযোগ ব্যবস্থাও বিপর্যস্ত হয়েছে। নলছাপড়া বাজার থেকে বালুচড়া উচ্চবিদ্যালয়ে যাওয়ার সেতু হিসেবে ব্যবহৃত রাস্তাটি প্রায় শতফুট দৈর্ঘ্য ধসে গভীর খাদের সৃষ্টি করেছে, যা এখন যান্ত্রিক যাতায়াতের জন্য সম্পূর্ণ অপ্রশস্ত। প্রতিদিনের চলমান জীবনে শিক্ষার্থী ও কৃষকদের মধ্যে চরম ভোগান্তির সৃষ্টি হয়েছে।

কৃষি খাতের ক্ষতি আরও ভয়াবহ। পাহাড়ি স্রোত নিয়ে আসা বালির আবরণে প্রায় পঞ্চাশ একর কৃষিজমি সম্পূর্ণভাবে ঢেকে পড়েছে। এর সাথে আমনধানের বীজতলা জলে তলিয়ে গেছে এবং গণনা করা অসম্ভব পরিমাণ পুকুর ও মাছের খামার সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত হয়েছে। স্থানীয় কৃষক ও মৎস্যচাষীদের এ দুর্ঘটনায় অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতি অগণিত।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, রাতের অন্ধকারে এত ভয়ংকর পানিপ্রবাহ তারা আগে কখনো দেখেননি। অনেক পরিবারের ঘর, দোকান এবং এমনকি মসজিদেও তিন থেকে চার ফুট পর্যন্ত পানি প্রবেশ করেছে। গজারমারী এলাকার বাসিন্দা রিপন মিয়া বলেন, প্রতিবছর যখনই এই মৌসুমে পাহাড়ি পানি নামে, তখন নদীর ভাঙন মারাত্মক আকার নেয়। তিনি অভিযোগ করেন যে, স্থানীয় চাহিদা অনুযায়ী খাল খনন ও বড় আকারের কালভার্ট স্থাপনের বারবার অনুরোধ অতিক্রম করে গেছে বছরের পর বছর, কিন্তু কোনো বাস্তব পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।

প্রতিবেশী আরেকজন বাসিন্দা আবুল কালাম জানান, এলজিইডি নির্মিত রাস্তায় প্রকৃত প্রয়োজনের চেয়ে অনেক কম সংখ্যক কালভার্ট নির্মাণ করা হয়েছে। ফলে পাহাড়ি ঢলের প্রবল পানি যাতায়াত পথ দিয়ে দ্রুত নিষ্কাশন না পেয়ে রাস্তার উপর দিয়ে প্রবাহিত হয় এবং আশেপাশের বসতবাড়িগুলোকে প্লাবিত করে।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্যানুযায়ী, উবদাখালী নদী কলমাকান্দা অঞ্চলে বিপদ সীমার চেয়ে পনের সেন্টিমিটার উপরে প্রবাহিত হচ্ছে। মেঘালয়ে যদি বৃষ্টি অব্যাহত থাকে, তাহলে পানির স্তর আরও বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে শুধুমাত্র কলমাকান্দা নয়, দুর্গাপুর উপজেলার গাঁওকান্দিয়া ইউনিয়নের একাধিক গ্রামেও পাহাড়ি পানির প্রবেশ শুরু হয়েছে। নদীতীরবর্তী বাসিন্দারা নতুন বন্যার আশঙ্কায় রাত জেগে কাটাচ্ছেন।

কলমাকান্দার সহায়ক কমিশনার (ভূমি) ও ভারপ্রাপ্ত উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোহাম্মদ শামসুজ্জামান আসিফ জানিয়েছেন যে, দুর্ঘটনার খবর পেয়েই ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলো পরিদর্শন করা হয়েছে। বিদ্যালয় ভবন, রাস্তা, কৃষিজমি এবং অন্যান্য অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি নথিভুক্ত করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট সকল বিভাগকে জরুরি ভিত্তিতে দ্রুততম সময়ে সংস্কার কাজ সম্পন্ন করতে নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে এবং মোট ক্ষয়ক্ষতির বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রস্তুতির কাজ চলমান রয়েছে।

কলমাকান্দার মানুষ মনে করেন, প্রতিবছর মেঘালয় থেকে নেমে আসা পাহাড়ি পানির কারণে তারা নদীভাঙন, পলিমাটির আবরণ ও হঠাৎ বন্যায় এমন বারবার ক্ষতির সম্মুখীন হতে চান না। স্থানীয় মানুষের জোর দাবি, সাময়িক মেরামতের পরিবর্তে নদীতীর সুরক্ষা, খালের পুনরুদ্ধার, যথাযথ সংখ্যক কালভার্ট নির্মাণ এবং দীর্ঘমেয়াদী বন্যা প্রতিরোধ কৌশল গ্রহণ করা অপরিহার্য। সকলের নজর এখন মেঘালয়ের আবহাওয়া দিকে নিবদ্ধ—সেখানে বৃষ্টিবর্ষণ থেমে না থাকলে এই অঞ্চলের দুর্ভোগ আরও বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিচ্ছে।

মন্তব্য (0)

মন্তব্য নীতি

এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনি করুন।