ধামরাইয়ের ঐতিহ্যবাহী রথযাত্রা আগামীকাল
Administrator
বাংলার ইতিহাসে এমন কিছু উৎসব আছে, যা কেবল ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং একটি জনপদের ইতিহাস, সংস্কৃতি, অর্থনীতি ও সম্প্রীতির প্রতীক হয়ে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে…
বাংলার ইতিহাসে এমন কিছু উৎসব আছে, যা কেবল ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং একটি জনপদের ইতিহাস, সংস্কৃতি, অর্থনীতি ও সম্প্রীতির প্রতীক হয়ে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে টিকে আছে। ঢাকার ধামরাই উপজেলার ঐতিহ্যবাহী জগন্নাথ রথযাত্রা তেমনই একটি উৎসব। প্রতি বছর আষাঢ় মাস এলেই ধামরাই পরিণত হয় লাখো মানুষের মিলনমেলায়। বিশাল কাঠের রথ, শঙ্খধ্বনি, উলুধ্বনি, কীর্তন, লোকসমাগম আর মাসব্যাপী মেলাকে ঘিরে মুখর হয়ে ওঠে গোটা জনপদ।
বাংলা পঞ্জিকার প্রতি বছরের আষাঢ় মাসের শুক্লপক্ষের দ্বিতীয় তিথিতে পালিত হয় রথযাত্রা। সে হিসাবে ১৬ জুলাই ধামরাই বাজারের রথখোলা এলাকা থেকে যাত্রাবাড়ী পর্যন্ত প্রথমে রথটান ও পরে ২৪ জুলাই উল্টোরথের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকতা শেষ হবে।
বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত রথযাত্রাগুলোর মধ্যে ধামরাইয়ের রথযাত্রা সবচেয়ে ঐতিহাসিক ও বিখ্যাত। গবেষক এবং ঐতিহাসিক নথিপত্রে এর ইতিহাস প্রায় চার শতাব্দী পুরোনো বলে উল্লেখ রয়েছে। যদিও সূচনার নির্দিষ্ট বছর নিয়ে কিছু মতভেদ রয়েছে, তবু স্থানীয় দলিল এবং গবেষণায় ১৬৭২ সালকে ধামরাই রথযাত্রার লিখিত ইতিহাসের সূচনা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
jwARI.fetch( $( "#ari-image-jw6a57bcec6c6d4" ) );
ধামরাই নামটি নিয়েও রয়েছে নানা মত। একদল গবেষক মনে করেন, "ধর্মরাজিকা" শব্দ থেকেই ধীরে ধীরে "ধামরাই" নামের উৎপত্তি। আবার কেউ কেউ মনে করেন, বৌদ্ধ ধর্মের "ধর্মরাজ" শব্দের সঙ্গে এর সম্পর্ক রয়েছে। পাল ও সেন আমল থেকেই এ অঞ্চল জনবসতিপূর্ণ ছিল এবং পরবর্তীকালে বৈষ্ণব ধর্মীয় সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে পরিচিতি লাভ করে।
স্থানীয় ঐতিহাসিক দলিল অনুযায়ী বাংলা ১০৭৯ সন (খ্রিস্টাব্দ ১৬৭২) থেকে ধামরাইয়ের রথযাত্রার লিখিত ইতিহাসের সন্ধান পাওয়া যায়। প্রাথমিক পর্যায়ে বাঁশ দিয়ে তৈরি রথে জগন্নাথদেবের যাত্রা অনুষ্ঠিত হতো। পরবর্তী সময়ে ধীরে ধীরে কাঠের রথ নির্মাণের প্রচলন শুরু হয়।
গবেষণায় জানা যায়, ১৭শ থেকে ১৯শ শতকের মধ্যে ধামরাইয়ে একাধিক রথ নির্মিত হয়। এ সময় মানিকগঞ্জের সাটুরিয়ার বালিয়াটির জমিদাররা রথ নির্মাণ ও উৎসব পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ পৃষ্ঠপোষকতা করেন। তাঁদের অর্থায়নেই ধামরাইয়ের রথযাত্রা পূর্ববঙ্গের অন্যতম বৃহৎ ধর্মীয় উৎসবে পরিণত হয়।
ধামরাইয়ের ইতিহাসে সবচেয়ে আলোচিত রথটি নির্মিত হয় ১৯৩৩ সালে (বাংলা ১৩৪০)। এক বছর ধরে ধামরাই, কালিয়াকৈর, সাটুরিয়া ও সিঙ্গাইরের দক্ষ কারিগরেরা এটি নির্মাণ করেন।
১৯৩৩ সালে নির্মিত ঐতিহাসিক ধামরাই রথটি ছিল তৎকালীন পূর্ববঙ্গের অন্যতম বৃহৎ ও দৃষ্টিনন্দন কাঠের রথ। প্রায় ৬০ ফুট উচ্চতা ও ৪৫ ফুট প্রস্থের এই তিনতলা নবরত্ন স্থাপত্যশৈলীর রথটি ৩২টি বিশাল কাঠের চাকার ওপর স্থাপিত ছিল। রথের সম্মুখভাগে কাঠের তৈরি দুটি অশ্বমূর্তি শোভা পেত এবং এর গায়ে রামায়ণ, মহাভারত, শ্রীকৃষ্ণের লীলাকথাসহ হিন্দু পুরাণের নানা দৃশ্য অত্যন্ত নিপুণ কারুকাজে খোদাই করা ছিল। বিশাল এই রথটি টানার জন্য ব্যবহৃত হতো প্রায় ১ হাজার কেজি পাটের আঁশ দিয়ে তৈরি অত্যন্ত মোটা ও শক্ত দড়ি, যা ধরে হাজার হাজার ভক্ত একযোগে রথ টানতেন।
তৎকালীন পূর্ববঙ্গে এত বড় কাঠের রথ আর কোথাও ছিল না বলে বিভিন্ন ঐতিহাসিক বর্ণনায় উল্লেখ রয়েছে।
jwARI.fetch( $( "#ari-image-jw6a57bcec6c6ed" ) );
১৯৫০ সালে জমিদারি প্রথা বিলুপ্ত হলে রথযাত্রার অর্থায়নে সংকট দেখা দেয়। তখন টাঙ্গাইলের মির্জাপুরের সমাজসেবক রায়বাহাদুর রণদা প্রসাদ সাহা রথযাত্রার প্রধান পৃষ্ঠপোষক হিসেবে এগিয়ে আসেন। তাঁর প্রতিষ্ঠিত কুমুদিনী ওয়েলফেয়ার ট্রাস্ট দীর্ঘদিন উৎসবের ব্যয়ভার বহন করে।
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ ধামরাইয়ের ইতিহাসেও এক বেদনাময় অধ্যায়। পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ঐতিহাসিক কাঠের রথে অগ্নিসংযোগ করে সেটি সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেয়। একই সময়ে রথযাত্রার অন্যতম পৃষ্ঠপোষক রণদা প্রসাদ সাহাকেও হত্যা করা হয়। এতে শুধু একটি স্থাপনা নয়, বাংলার কয়েক শত বছরের একটি অমূল্য ঐতিহ্য ধ্বংস হয়ে যায়।
স্বাধীনতার পর স্থানীয় হিন্দু সম্প্রদায়, সমাজসেবী ও সংস্কৃতিপ্রেমীদের উদ্যোগে বাঁশের অস্থায়ী রথ তৈরি করে ঐতিহ্য ধরে রাখা হয়। পরে দীর্ঘ প্রচেষ্টার পর ২০১০ সালে নতুন কাঠের তিনতলা রথ নির্মিত হয়। বর্তমান রথটির দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ ২৭ ফুট, এতে ১৫টি চাকা রয়েছে এবং বিভিন্ন দেবদেবীর ভাস্কর্যে এটি অলংকৃত।
হিন্দু ধর্মমতে, আষাঢ় মাসের শুক্লপক্ষের দ্বিতীয়া তিথিতে ভগবান জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রা রথে চড়ে মাসির বাড়ির উদ্দেশে যাত্রা করেন। আট দিন পর অনুষ্ঠিত হয় উল্টো রথ।
ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, রথের দড়ি টানলে পুণ্য লাভ হয়। তাই হাজার হাজার মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে রথ টানতে অংশ নেন।
ধামরাইয়ের রথমেলা বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ ও ঐতিহ্যবাহী গ্রামীণ মেলা। বাংলাপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, এটি দেশের সবচেয়ে বিখ্যাত রথমেলাগুলোর একটি এবং প্রতিবছর প্রায় এক মাসব্যাপী চলে। রথযাত্রাকে কেন্দ্র করে বসা এই মেলায় মাটির খেলনা, বাঁশ-বেতের সামগ্রী, কাঁসা-পিতলের তৈজসপত্র, কাঠের কারুশিল্প, লোকজ বাদ্যযন্ত্র, বিভিন্ন ধরনের মিষ্টান্নসহ গ্রামীণ জীবনের নানা ঐতিহ্যবাহী পণ্য বিক্রি হয়। পাশাপাশি নাগরদোলা, সার্কাস, যাত্রাপালা, পুতুলনাচ ও লোকসংগীতের মতো বিনোদনের আয়োজন মেলাটিকে আরও প্রাণবন্ত করে তোলে। শুধু ধর্মীয় উৎসব বা কেনাবেচার ক্ষেত্র হিসেবেই নয়, ধামরাইয়ের রথমেলা স্থানীয় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, কারুশিল্পী ও উদ্যোক্তাদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক প্ল্যাটফর্ম, যা গ্রামীণ অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখে আসছে।
ধামরাইয়ের রথযাত্রার সবচেয়ে বড় শক্তি হলো সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি। মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টান—সব সম্প্রদায়ের মানুষ উৎসবটিকে নিজেদের ঐতিহ্য হিসেবে গ্রহণ করেছেন। রথযাত্রার নিরাপত্তা, মেলা পরিচালনা এবং অতিথি আপ্যায়নে স্থানীয় মানুষ সম্মিলিতভাবে অংশ নেন।
প্রতি বছর দেশ-বিদেশের হাজারো পর্যটক, আলোকচিত্রী ও গবেষক ধামরাইয়ে আসেন। পরিকল্পিত অবকাঠামো, তথ্যকেন্দ্র, ঐতিহ্য জাদুঘর এবং আন্তর্জাতিক প্রচারণা গড়ে তোলা গেলে ধামরাইয়ের রথযাত্রা দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম সাংস্কৃতিক পর্যটন আকর্ষণে পরিণত হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ধামরাইয়ের রথযাত্রা শুধু একটি ধর্মীয় উৎসব নয়; এটি বাংলাদেশের অমূর্ত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। রথের নির্মাণশৈলী, ইতিহাস, লোককথা, মেলা এবং কারুশিল্পকে পদ্ধতিগতভাবে নথিভুক্ত করা, গবেষণা পরিচালনা এবং ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক অমূর্ত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের স্বীকৃতির জন্য উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
চার শতকেরও বেশি সময় ধরে ধামরাইয়ের রথ শুধু একটি কাঠের স্থাপনা নয়—এটি ইতিহাসের চাকা, যা বাংলার ঐতিহ্য, বিশ্বাস, শিল্প, সম্প্রীতি ও মানুষের আবেগকে যুগের পর যুগ বহন করে চলেছে। সময় বদলেছে, রাজনীতি বদলেছে, সমাজ বদলেছে; কিন্তু ধামরাইয়ের রথযাত্রা আজও প্রমাণ করে, ঐতিহ্যের শিকড় যত গভীর হয়, তাকে মুছে ফেলা তত কঠিন।
রথযাত্রার সর্বশেষ প্রস্তুতির বিষয়ে ধামরাই যশোমাধব মন্দির পরিচালনা পর্ষদের সহসভাপতি নন্দ গোপাল সেন বলেন, থানা, উপজেলা প্রশাসন ও এমপির সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। তারা আশ্বস্ত করেছেন–অন্যান্য বছরের মতো এবারও নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তায় উৎসবমুখর পরিবেশে রথযাত্রা উৎসব পালিত।
তিনি বলেন, উৎসব সুন্দরভাবে পালন করতে বেশ কয়েকটি উপকমিটি করে থাকি। সেগুলো কাজ শুরু করেছে। রথের কাঠের কাজ শেষ হয়েছে। রংয়ের কাজ করা হচ্ছে। বৃষ্টির জন্য কাজে কিছুটা বিঘ্ন ঘটলেও সঠিক সময়ে কাজ শেষ করে সুন্দর পরিবেশে রথযাত্রা উৎসব পালন করতে পারব।
ধামরাই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. নাজমুল হুদা খান বলেন, হিন্দু ধর্মালম্বীদের অন্যতম বড় উৎসব রথযাত্রাকে কেন্দ্র করে নিরাপত্তায় সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। প্রয়োজনীয় সব স্থানে পুলিশ মোতায়েন থাকবে। উৎসব সুন্দরভাবে পালন করতে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে।
ধামরাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আল মামুন বলেন, রথযাত্রা উপলক্ষে সব ধরনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। জেলা প্রশাসক অবগত রয়েছেন। তিনি সার্বিক দিকনির্দেশনা দিয়েছেন।
ইউএনও আরও বলেন, আশা করছি অন্যান্য বছরের মতো এবারও উৎসবমুখর পরিবেশে রথযাত্রা উদযাপিত হবে। পুলিশসহ অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী প্রস্তুত রয়েছে। উপজেলা প্রশাসনও কাজ করছে।
মন্তব্য (0)
মন্তব্য নীতিএখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনি করুন।