আদালতি সিদ্ধান্তের অবমাননা: মৌলভীবাজারে অবৈধ বালু উত্তোলনে সংগঠিত চক্রের লীলা
Administrator
উচ্চ আদালতের ২০১৬ সালের নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও মৌলভীবাজারের পাহাড়ি ছড়া থেকে সিলিকা বালু অবৈধভাবে উত্তোলিত হচ্ছে, যা পরিবেশ ও সরকারি রাজস্বের মারাত্মক ক্ষতি করছে।
মৌলভীবাজার জেলার বিভিন্ন এলাকায় অবস্থিত শতাধিক পাহাড়ি ছড়া থেকে অবৈধ সিলিকা বালু উত্তোলনের ফলে এখন গুরুতর ক্ষতি দেখা যাচ্ছে। এই সব জলধারার বাঁধ, টিলা, রাস্তাঘাট এবং কৃষিভূমি ক্রমাগত ক্ষয়প্রাপ্ত হচ্ছে। কমলগঞ্জ উপজেলাসহ জেলার নানা প্রান্তে উচ্চ আদালতের সুস্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা অগ্রাহ্য করে বেপরোয়া উত্তোলন কাজ চলছে। এর প্রভাবে একদিকে সরকার উল্লেখযোগ্য রাজস্ব হারাচ্ছে, অন্যদিকে প্রাকৃতিক পরিবেশ ও প্রতিবেশ তীব্র সংকটের সম্মুখীন হয়েছে।
সরকারি খনিজসম্পদ উন্নয়ন বিভাগের অনুমোদিত তথ্য অনুযায়ী মৌলভীবাজার জেলায় মোট ৩৩টি সিলিকা বালু কোয়ারি বিদ্যমান। এর চেয়ে অধিক সংখ্যক ছড়া চিহ্নিত করেছে বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা)। সংস্থাটি ২০১৩ সালের ১৮ জুন তারিখে একটি প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে জেলার ৫১টি পাহাড়ি ছড়াকে সিলিকা বালু সম্পৃক্ত এলাকা হিসেবে সনাক্ত করে নথিভুক্ত করে।
এই ৫১টি ছড়ার মধ্য থেকে ১৯টিতে যান্ত্রিক পদ্ধতির বালু উত্তোলনের ইজারা দেওয়া হয়েছিল। তবে ইজারাধারীরা নিয়ন্ত্রণহীন এবং বেআইনি উপায়ে বালু সংগ্রহ করতে থাকায় জলবায়ু ও প্রতিবেশ নিয়ে আসে গভীর বিপর্যয়। এই অবস্থায় বেলা সংস্থা জনস্বার্থ সুরক্ষার লক্ষ্যে ২০১৬ সালের ৮ মার্চ একটি রিট পিটিশন হাইকোর্টে দায়ের করে। মামলার শুনানি সম্পন্ন হওয়ার পর একই মাসের ২১ তারিখে হাইকোর্টের ডিভিশন বেঞ্চ উল্লিখিত ১৯টি বালুমহালে ভবিষ্যতে কোনো ইজারা প্রদান না করার জন্য সুনির্দিষ্ট আদেশ জারি করেন। এই আপিল বিভাগীয় রায় সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে কমলগঞ্জের দেওছড়া, সুনছড়া, জপলাছড়া, লাউয়াছড়াসহ একাধিক জলধারা থেকে প্রতিদিন বিশাল পরিমাণ সিলিকা বালু উত্তোলিত হচ্ছে। স্থানীয় রাজনৈতিক মহলের একটি শক্তিশালী অংশ এই অনৈতিক বালু বাণিজ্যে প্রত্যক্ষভাবে সংযুক্ত থাকায় প্রশাসন বাস্তব ব্যবস্থা নিতে সক্ষম হচ্ছে না।
স্থানীয় জনগোষ্ঠীর বর্ণনা অনুযায়ী এই বালু লুটপাট গোষ্ঠী অত্যন্ত সাহসী এবং সতর্ক। তারা বিশাল শ্রমিক বাহিনী নিয়োগ করে ছড়া থেকে বালু সংগ্রহ করছে এবং তৎক্ষণাৎ ট্রাক, পিকআপ, ট্রলি ও ঠেলাগাড়িতে লাদিয়ে বাজারে প্রেরণ করছে। প্রশাসনিক লোকজনের আগমনের সংবাদ আগাম পেয়ে তারা কর্মক্ষেত্র ত্যাগ করে দূরে সরে যায়, এবং অভিযান সংক্ষান্ত হওয়ার পরপরই পুনরায় কর্মতৎপর হয়ে ওঠে।
এ সম্পর্কে বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির সিলেট বিভাগীয় সমন্বয়ক শাহ সাহেদা আক্তার মন্তব্য করেছেন যে, বৈধ ইজারা ব্যতিরেকে বালু উত্তোলনের কাজ সম্পূর্ণভাবে অপরাধী প্রকৃতির। এ ধরনের বেআইনি কর্মকাণ্ড প্রতিরোধের প্রাথমিক দায়িত্ব পরিপালন করে আসে প্রশাসন। যারা এই অবৈধ উদ্যোগকে লালনপালন করছেন, তারা মূলত সর্বোচ্চ আদালতের রায়ের মর্যাদা ক্ষুণ্ণ করছেন।
কমলগঞ্জ উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আসাদুজ্জামান জানিয়েছেন যে জেলা প্রশাসকের নিকট পৌঁছানো একটি আবেদনের ভিত্তিতে তিনি সম্প্রতি দেওছড়া এলাকা পরিদর্শন করেছেন। পরবর্তীকালে পুনরায় ওই এলাকায় অনৈতিক বালু সংগ্রহের তথ্য লাভ করে বুধবার দুপুরবেলায় প্রশাসনিক পক্ষ থেকে নিরীক্ষা পরিচালনা করা হয়েছে, কিন্তু সেখানে কোনো অপরাধী উপাদান চিহ্নিত করা যায়নি। অন্যান্য ছড়াগুলি থেকে সংঘটিত বালু অপচয় নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে নিয়মিত অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
মন্তব্য (0)
মন্তব্য নীতিএখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনি করুন।