অস্ট্রেলিয়া সফরে বাংলাদেশের সংকট: তারকা খেলোয়াড়রা চোটে পড়েছেন
Administrator
বাংলাদেশের দল ২৩ বছর পর অস্ট্রেলিয়া সফরে যেতে যাচ্ছে কিন্তু তিনজন মূল খেলোয়াড় চোটের কারণে বাদ যাচ্ছে। বিশেষ করে লিটন এবং নাহিদের ব্যবস্থাপনা নিয়ে বিসিবির মেডিক্যাল বিভাগের বিরুদ্ধে প্রশ্ন উঠেছে।
প্রতিটি দ্রুতগতির পেসার অস্ট্রেলিয়ার পিচে নিজের সামর্থ্য প্রদর্শনের স্বপ্ন দেখে, ঠিক যেমন ব্যাটসম্যানরা সেখানকার কঠিন পরিস্থিতিতে তাদের দক্ষতা প্রমাণ করতে চায়। টেস্ট ক্রিকেটের জগতে অস্ট্রেলিয়া সবসময়ই একটি কাঙ্ক্ষিত গন্তব্য, এবং প্রতিটি খেলোয়াড় সেই মাটিতে খেলার সুযোগ পেতে আগ্রহী থাকে।
দুই দশকেরও বেশি সময় পর বাংলাদেশ দল এখন অস্ট্রেলিয়ায় যাচ্ছে দুটি টেস্ট ম্যাচের জন্য। এই দীর্ঘ বিরতিতে একটি সম্পূর্ণ প্রজন্মের ক্রিকেটার তৈরি হয়েছে যারা কখনো অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টেস্ট খেলেননি। সাকিব আল হাসান, তামিম ইকবাল এবং মাহমুদউল্লাহর মতো অভিজ্ঞ খেলোয়াড়রাও এই সুযোগ পাননি। শুধুমাত্র মুশফিকুর রহিম টেস্ট ক্রিকেট অব্যাহত রেখেছেন, এবং এবার তিনি সেই পুরানো প্রজন্মের একমাত্র প্রতিনিধি হিসেবে এই ঐতিহাসিক সফরে থাকার সুযোগ পাবেন।
কিন্তু এই প্রত্যাশিত সফরে বাংলাদেশ গুরুতর সমস্যার সম্মুখীন। তিনজন গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় চোটের কারণে সিরিজে অনুপস্থিত থাকবেন। দলের শীর্ষ পেসার নাহিদ রানা সাইড স্ট্রেইন নিয়ে কোনো টেস্টেই খেলতে পারবেন না। লিটন দাস, যাকে ব্যাটিংয়ে দীর্ঘ প্রতীক্ষা থাকে, ডারউইনের প্রথম টেস্ট থেকে বাদ যাবেন কাফ মাসলের আঘাতে। হ্যামস্ট্রিং সমস্যার কারণে শরীফুল ইসলামও এই ম্যাচে অংশ নিতে পারবেন না।
এই আঘাতগুলি কেবল খেলোয়াড়দের জন্যই নয়, বিসিবির চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে। বিশেষ করে লিটন এবং নাহিদের ক্ষেত্রে সংশয় ও সমালোচনা উঠেছে। গতকাল প্রথম টেস্টের দল ঘোষণার পর আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে প্রধান নির্বাচক হাবিবুল বাশার এই বিষয়ে প্রশ্নের সম্মুখীন হয়েছেন। বিসিবির মেডিক্যাল বিভাগের দায়িত্বশীলতা নিয়েও আঙুল উঠেছে।
জিম্বাবুয়ে সফরের দ্বিতীয় টি-টুয়েন্টি ম্যাচে নাহিদ সাইড স্ট্রেইনে আক্রান্ত হয়েছিলেন পাঁজরের বাঁ পাশে। বিসিবি জানিয়েছে যে অস্ট্রেলিয়া সিরিজের আগে সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা নেই, তাই কোনো টেস্টেই তিনি খেলতে পারবেন না। সম্পূর্ণ সুস্থতার জন্য তার দেড় থেকে দুই মাস প্রয়োজন। অথচ জিম্বাবুয়ে সফরে অনেকে প্রশ্ন তুলেছে: যখন অস্ট্রেলিয়া টেস্ট সিরিজ সামনে ছিল, তখন কেন তাকে টি-টুয়েন্টি সিরিজে খেলানো হলো? ওয়ানডেতে র্যাঙ্কিংয়ের বিষয় থাকে, কিন্তু টি-টুয়েন্টিতে তো তা নেই। তাকে বিশ্রাম দেওয়া যেত না কেন?
প্রধান নির্বাচক হাবিবুল বাশার এই অভিযোগ সরাসরি খণ্ডন করেছেন। তিনি বলেছেন, নাহিদকে 'ওয়ার্কলোড' ম্যানেজ করে খেলানো হচ্ছে। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে হোম সিরিজে তাকে সব ম্যাচ খেলানো হয়নি এবং জিম্বাবুয়ের টেস্ট ও একটি ওয়ানডেতে বিশ্রাম দেওয়া হয়েছিল। তার ব্যাখ্যায় বলেছেন, ফাস্ট বোলারদের তারা রেড, গ্রিন এবং ইয়েলো তিনটা জোনে রাখে। যদি বেশি বল করে ওভারলোড হয় তারা রেড জোনে যায়, আবার কম বোলিং করলেও রেড জোনে চলে যায়। তার মানে একজন বোলারকে সঠিক পরিমাণ বোলিং করতে হবে। নাহিদকে টেস্ট খেলার আগে পর্যাপ্ত বোলিং করতে হবে, তাই তাকে কিছু খেলতেই হয়েছে।
আধুনিক ক্রিকেটে জিপিএস ট্র্যাকার ব্যবহার করে একজন খেলোয়াড় কত ম্যাচ খেলতে পারবে বা কতক্ষণ অনুশীলন করতে পারবে তা ট্র্যাক করা সম্ভব। প্রধান নির্বাচক উল্লেখ করেছেন যে এখন জিপিএস ট্র্যাকার থাকায় সবকিছু ট্র্যাক করা যায়—কে কোন ম্যাচ খেলবে, কয়টা খেলবে, কোন সিরিজে কী খেলতে পারবে, এসব সবার জন্যই। তবে বাস্তবে এক অমোঘ সত্য হলো, একজন ফাস্ট বোলার ফাস্ট বোলিং করবে এবং চোটে পড়বে না—এটা প্রায় অসম্ভব। সর্বোচ্চ চেষ্টার পরেও অপ্রত্যাশিত কিছু ঘটতে পারে, আর তাই ঘটেছে নাহিদের ক্ষেত্রে।
লিটন দাসের চোট নিয়ে অভিযোগ বেশি তীব্র। তার আঘাত জুন চতুর্দশে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে তৃতীয় ওয়ানডেতে ব্যাটিংয়ের সময় পেয়েছিলেন। সেই ওয়ানডের শেষে ৫৮ রান অপরাজিত করেছিলেন। তেমন সমস্যা মনে না করায় পরের টি-টুয়েন্টি সিরিজে দলে রাখা হয়েছিল, দ্বিতীয় ম্যাচে খেলার পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু চট্টগ্রামে জুন ১৭-তে স্ক্যান করায় গ্রেড ওয়ান টিয়ার ধরা পড়ে। এরপর ঢাকায় এসে পুনর্বাসন শুরু করেন। একপর্যায়ে প্রাথমিক আঘাতের কাছাকাছি আরেকটি জায়গায় ব্যথার অভিযোগ জানান। জুন ২৭-তে ঢাকায় আবার স্ক্যান করানো হয়। রিপোর্টে দেখা যায় চট্টগ্রামের আঘাত কিছুটা ভালো হয়েছে, তবে নতুন জায়গায় কোনো সমস্যা পাওয়া যায়নি।
এই অবস্থায় টিম ম্যানেজমেন্ট দলের ফিজিও-ট্রেনারের সাথে আলোচনা করে 'ক্যালকুলেটিভ রিস্ক' নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। তারা ধারণা করেছিল, টেস্ট খেলতে না পারলেও জিম্বাবুয়ের দ্বিতীয় ওয়ানডের আগে লিটন সম্পূর্ণ সুস্থ হবেন। সেই বিশ্বাসে তাকে জিম্বাবুয়ে সফরে নিয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু সেখানেও ব্যথার অভিযোগ জানাতে শেষ পর্যন্ত কোনো ম্যাচেই তাকে খেলানো হয়নি। চীনে ব্যক্তিগত সফর করে ফেরার পর তাকে সিঙ্গাপুরে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসার জন্য পাঠায় বিসিবি। জুলাই ২৩-তে সিঙ্গাপুর জেনারেল হাসপাতালে স্ক্যান করানোর ফলাফলও একই ছিল—প্রাথমিক আঘাত অনুরূপ অবস্থায়, নতুন জায়গায় কোনো সমস্যা নেই। তবে মাংসপেশি কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত।
সাধারণত এ ধরনের চোট দুই থেকে তিন সপ্তাহে ভালো হয়ে যায়। দেড় মাস হতে চলেছে, অথচ লিটন এখনো সম্পূর্ণ ফিট নন। কেন এই বিলম্ব? বিসিবির সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের পাশাপাশি খেলোয়াড়ের ফিটনেস, খাদ্যাভ্যাস এবং ঘুমের মতো ব্যক্তিগত বিষয়গুলোও গুরুত্বপূর্ণ। ২৭ জুন ঢাকার স্ক্যান রিপোর্ট এবং সিঙ্গাপুরের রিপোর্ট একই রকম এসেছে কেন? এই সময়ে কেন যথেষ্ট উন্নতি হলো না? একটি সূত্র জানিয়েছে, জিম্বাবুয়েতে ফিটনেস টেস্ট দেওয়ার সময় লিটনের আঘাতের জায়গায় নতুন চাপ লেগে থাকতে পারে। তবে এটিও নিশ্চিত কারণ নয়।
প্রধান নির্বাচক হাবিবুল বাশার এই সব অভিযোগ ও আলোচনায় বলেছেন, বিসিবির মেডিক্যাল বিভাগের কোনো দায় নেই। কারণ এসব সিদ্ধান্ত স্ক্যান এবং বিভিন্ন পরীক্ষার রিপোর্টের ভিত্তিতে নেওয়া হয়। এই পরীক্ষা-নিরীক্ষা দেশ-বিদেশের সেরা হাসপাতালগুলোতে করানো হয়। বাস্তবে লিটন অস্ট্রেলিয়া সিরিজের শেষ ওয়ানডেতে চোট পেলেও পরে বাঁচিয়ে ৫৮ রান করেছেন, যা প্রাথমিকভাবে গুরুতর মনে হয়নি। এই কারণে টি-টুয়েন্টিতে রাখা হয়েছিল, দ্বিতীয় ম্যাচে খেলার পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু এরপরের স্ক্যানে গ্রেড ওয়ান টিয়ার আবিষ্কৃত হয়।
মন্তব্য (0)
মন্তব্য নীতিএখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনি করুন।