শিক্ষক হান্নানের পেঁপে সাফল্যের গল্প: দেড় লাখ টাকার বিনিয়োগে দশ লাখ টাকার রাজস্ব
Administrator
কুষ্টিয়ার একজন শিক্ষক দেড় লাখ টাকা বিনিয়োগ করে পেঁপে চাষ থেকে দশ লাখ টাকার আয়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছেন এবং তার সাফল্য এলাকার অন্যান্য কৃষকদেরও পেঁপে চাষে উৎসাহিত করছে।
কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার দরবেশপুর গ্রামে বাস করেন মো. আবদুল হান্নান। বয়স ৪৬ বছর। তেবাড়ীয়া শেরকান্দী মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ে তিনি সহকারী শিক্ষক হিসেবে কাজ করেন, লাইব্রেরি ও তথ্যবিজ্ঞান বিষয়ের দায়িত্বে। শিক্ষকতার পাশাপাশি নিজের গ্রামের প্রায় তিন বিঘা জমিতে তিনি মানিকগঞ্জ শাহি জাতের পেঁপে চাষ করছেন এবং এতে দারুণ সফলতা পাচ্ছেন।
প্রায় চার বছর আগে ইউটিউবে দেখা আধুনিক পদ্ধতির প্রভাবে হান্নান পেঁপে চাষে উৎসাহী হন। শুরুর দিকে তার প্রচেষ্টা সফল হয়নি। ২০২৩ সালে একশত গাছ রোপণ করেও কোনো লাভ পাননি। ২০২৪ সালে বগুড়া থেকে ছয়শত হাইব্রিড চারা এনে দেড় বিঘায় রোপণ করে আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হন। তবে নিরাশ না হয়ে ২০২৫ সালের প্রথম দিকে মানিকগঞ্জ থেকে দেশীয় শাহি জাতের ছয়শত চারা সংগ্রহ করে দেড় বিঘায় আবার রোপণ করেন। চার মাসে ফুল এবং পাঁচ মাসে ফল বিক্রির উপযোগী হয়ে উঠলে তার দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটে।
এই বছর আট মাস আগে হান্নান প্রতিটি বিঘায় চারশত চারা সারিবদ্ধভাবে রোপণ করেছিলেন, মোট এক হাজার দুইশত চারা। রোপণ ও পরিচর্যায় খরচ হয়েছে এক লাখ পঞ্চাশ হাজার টাকা। গত মে মাসের শেষ থেকে ফলন শুরু হয়। দুই মাসে তিনি দুইশত দশ মণ কাঁচা পেঁপে পাইকারি বাজারে বিক্রয় করেছেন কেজিপ্রতি বিশ থেকে পঁয়ষট্টি টাকা হারে, মোট এক লাখ সত্তর হাজার টাকায়। আগামী পাঁচ মাসে আবহাওয়া অনুকূল থাকলে আরও চার শত মণ পেঁপে বিক্রয়ের লক্ষ্য রেখেছেন, যা আনবে অন্তত তিন লাখ টাকা।
বীজ উৎপাদনেও হান্নান মনোযোগ দিয়েছেন। চলতি বছর আশি কেজি বীজ তৈরির পরিকল্পনা করছেন, যা প্রতি কেজিতে সাত হাজার টাকায় বিক্রয়ের আশা রাখছেন, মোট পাঁচ লাখ ষাট হাজার টাকা। সব মিলিয়ে দশ লাখ টাকার রাজস্ব প্রত্যাশা করছেন মাত্র দেড় লাখ টাকার বিনিয়োগে। এতে তার নিট লাভ দাঁড়ায় সাড়ে আট লাখ টাকা। গত বছর দেড় বিঘার বাগান থেকে তিনশত দশ মণ পেঁপে ও চল্লিশ কেজি বীজ বিক্রি করে চার লাখ টাকা লাভ করেছিলেন।
হান্নানের অভিজ্ঞতা অনুযায় প্রতিটি গাছে খরচ পড়ে দেড় থেকে দুইশত টাকা এবং তা থেকে পাওয়া যায় ষাট থেকে একশত পঞ্চাশ কেজি পর্যন্ত পেঁপে। একটি বিঘা জমিতে পঞ্চাশ হাজার টাকা বিনিয়োগ করে দুই থেকে সাড়ে দুই লাখ টাকার পেঁপে উৎপাদন করা সম্ভব বলে তিনি মনে করেন। এই লাভজনক খবর ছড়িয়ে পড়েছে চারপাশে এবং দূর-দুরান্ত থেকে কৃষকেরা তার বাগান দর্শনে আসছেন।
দরবেশপুর গ্রামের কৃষক অমল কুমার বিশ্বাস জানান যে হান্নান এই এলাকায় প্রথম ব্যক্তি যিনি বাণিজ্যিক ভিত্তিতে পেঁপে চাষ শুরু করেছেন। তার সাফল্য দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে বিশ্বাস নিজেও পনেরো শতক জমিতে পেঁপে চাষ করছেন, দশ হাজার টাকা খরচ করে। এখন পর্যন্ত তিনি ত্রিশ হাজার টাকার পেঁপে বিক্রি করেছেন। হান্নানের ভাগনে দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী মো. ফাহিম মামার সাফল্য দেখে পারিবারিক দশ কাঠা জমিতেও পেঁপে চাষ করছে।
সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রকাশিত খবর দেখে গত শুক্রবার মোস্তাফিজুর রহমান নামের একজন তার বাগান পরিদর্শন করেন এবং আগামী বছর পাঁচশত বীজ নিয়ে পেঁপে চাষ শুরু করার পরিকল্পনা করছেন। বিভিন্ন জাতের পেঁপে বীজ ও চারা অনলাইন-অফলাইনে বিক্রি করেন মাসুদ রানা। অনেক বাগান দেখার অভিজ্ঞতা থেকে তিনি বলেন, হান্নানের বাগানটি সেরা, আগা থেকে গোড়া পর্যন্ত ফলে ভরা প্রতিটি গাছ, প্রতিটি পেঁপের ওজন দেড় থেকে ছয় কেজির মধ্যে এবং বীজের মান অতুলনীয়।
চলতি বছর কুমারখালী উপজেলায় প্রায় দুইশত বিঘা জমিতে পেঁপের চাষ হয়েছে উল্লেখ করে উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা মো. কাওসার আলী বলেন, মানিকগঞ্জ শাহি জাত কম রোগব্যাধি সহ্য করে এবং ফলনও ভালো হয়। শিক্ষকতার পাশাপাশি হান্নান একজন সফল পেঁপেচাষি। তার সাফল্য অনুসরণ করে অন্যরা পেঁপে চাষে আগ্রহী হচ্ছেন। এই উদ্যোগকে এগিয়ে নিতে সরকারি প্রণোদনা ও কারিগরি সহায়তা প্রদান করা হবে।
মন্তব্য (0)
মন্তব্য নীতিএখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনি করুন।