শুক্রবার, ১৪ আগস্ট ২০২৬

রাষ্ট্রপতি হিসেবে মো. সাহাবুদ্দিনের তিন বছর: অপ্রত্যাশিত পথে আসা, বিতর্কে জর্জরিত প্রস্থান

2 সপ্তাহ আগে | আপডেট: 2 সপ্তাহ আগে | রাজনীতি

Administrator

রাষ্ট্রপতি হিসেবে মো. সাহাবুদ্দিনের তিন বছর: অপ্রত্যাশিত পথে আসা, বিতর্কে জর্জরিত প্রস্থান

মো. সাহাবুদ্দিন অপ্রত্যাশিত মনোনয়নে রাষ্ট্রপতি হয়েছিলেন এবং তার তিন বছরের মেয়াদ বিতর্ক ও অভিযোগে পূর্ণ ছিল, যা শেষে তার পদত্যাগে পরিণত হয়।

সর্বশেষ সব খবরের জন্য দৈনিক খবর সংযোগের গুগল নিউজ চ্যানেল অনুসরণ করুন।

২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে আওয়ামী লীগ যখন মো. সাহাবুদ্দিনকে রাষ্ট্রপতি প্রার্থী ঘোষণা করে, তা দলের অভ্যন্তরীণ মহলেও সমূহ আলোড়ন সৃষ্টি করে। দলের শীর্ষস্থানীয় নেতারা প্রাথমিকভাবে এই সিদ্ধান্তে অবাক হয়েছিলেন কারণ অন্যান্য সিনিয়র নেতৃত্বকে এ পদের জন্য প্রস্তুত মনে করা হচ্ছিল।

আওয়ামী লীগের সংখ্যাগরিষ্ঠতা সংসদে অপ্রতিদ্বন্দ্বিত নির্বাচনের পথ প্রশস্ত করে দেয়। দলের প্রধান শেখ হাসিনা এবং তার বোন শেখ রেহানা যৌথভাবে এই মনোনয়নের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন বলে অভ্যন্তরীণ কথোপকথনে জানা যায়। সাহাবুদ্দিন তখন আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা কমিটির সদস্য এবং একই বছরের ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত দলীয় সম্মেলনে নির্বাচন প্রক্রিয়ার তদারকি করেছিলেন, কিন্তু তাকে কেন এই গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক পদের জন্য মনোনীত করা হলো তার যথাযথ ব্যাখ্যা কখনো জনসম্মুখে আসেনি।

সাহাবুদ্দিনের জীবনপ্রবাহ তার নতুন ভূমিকার জন্য কোনো শক্তিশালী ভিত্তি প্রদান করে না। বিচারক হিসেবে তার কর্মকাণ্ড সুনামের সাথে সম্পর্কিত ছিল না, এবং পরবর্তীতে দুর্নীতি দমন কমিশনের নেতৃত্বে তার আরো বিতর্কিত হয়ে ওঠে। দুই হাজার এগারো থেকে দুই হাজার ষোলো পর্যন্ত এ দায়িত্বে থাকাকালীন তার বিরুদ্ধে নিয়মবহির্ভূত আচরণের অভিযোগ ওঠে।

গত এক দশকে একাধিক প্রধান দুর্ঘটনা সাহাবুদ্দিনের সাথে জড়িত হয়ে যায়, বিশেষত পদ্মা সেতু প্রকল্পের পরামর্শক নিয়োগে অনুমিত দুর্নীতি এবং বেসিক ব্যাংকের বিশাল আর্থিক অনিয়মের বিষয়ে তার সংস্থার ভূমিকা নিয়ে। পদ্মা সেতু সংক্রান্ত তদন্তে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন এবং দুই হাজার বারো সালে পরামর্শক নিয়োগকে কেন্দ্র করে একটি মামলা দায়ের করা হয়েছিল সাতজন ব্যক্তির বিরুদ্ধে, যদিও দুই বছর পর সেই মামলা প্রমাণের অভাবে বন্ধ করা হয়।

সাহাবুদ্দিন দুদকের কমিশনার থাকার সময় বেসিক ব্যাংকের আলোচিত ঋণ কেলেঙ্কারির তদন্ত নিয়েও সংস্থাটি প্রশ্নের মুখে পড়েছিল।

বেসিক ব্যাংকের দুই হাজার সাতত্রিশ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে দুদক পঞ্চাশটিরও বেশি মামলা তৈরি করেছিল কিন্তু ব্যাংকটির নীতি নির্ধারণী কর্তৃপক্ষের শীর্ষ অফিসারদের বিরুদ্ধে প্রাথমিক অভিযোগপত্রে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। পরে দুই হাজার তেইশ সালে, সরকারের পতনের পর সংস্থাটি অভিযোগপত্রে ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান শেখ আবদুল হাই বাচ্চুকে প্রতিবাদী করে। তদন্তে নিয়োজিত কর্মীরা স্বীকার করেন যে প্রাথমিকভাবে উচ্চপর্যায়ের চাপের কারণে শীর্ষ ব্যবস্থাপনার বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব হয়নি।

তার দুর্নীতি দমন কমিশনের দায়িত্ব সমাপ্তির পর, সাহাবুদ্দিন ইসলামী ব্যাংক ও এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংকের সাথে যুক্ত হন, উভয় প্রতিষ্ঠানই ব্যবসায়ী এস আলম গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে ছিল। দুই হাজার সতেরো সালে এস আলম গ্রুপ ইসলামী ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করলে তিনি সেখানে স্বতন্ত্র পরিচালক এবং উপ-চেয়ারম্যানের আসন গ্রহণ করেন। রাষ্ট্রপতির পদে মনোনয়নের পর তিনি দুই হাজার তেইশ সালের ফেব্রুয়ারিতে ব্যাংক সংশ্লিষ্ট দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ান।

সাংবিধানিক যোগ্যতার প্রশ্ন আদালতে পৌঁছায় কারণ দুদক আইনের একটি ধারা স্পষ্ট করে যে এই সংস্থার নেতৃত্বে থাকা ব্যক্তিরা পরবর্তীতে রাষ্ট্রের লাভজনক পদে নিয়োগপ্রাপ্ত হতে পারেন না। দুটি রিট পিটিশন আদালতে জমা দেওয়া হলে উচ্চ আদালত রাষ্ট্রপতির পদকে লাভজনক পদের বাইরে ব্যাখ্যা দিয়ে রিটগুলো খারিজ করে এবং আপিল বিভাগ এই সিদ্ধান্ত বজায় রাখে।

রাষ্ট্রপতি হিসেবে সাহাবুদ্দিনের মেয়াদে সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক ঝড় তৈরি হয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পদত্যাগ সংক্রান্ত বিবৃতি নিয়ে। দুই হাজার চব্বিশ সালের আগস্টের পাঁচ তারিখে জাতির নামে প্রদত্ত একটি ভাষণে তিনি দাবি করেন যে হাসিনা তার কাছে ব্যক্তিগতভাবে পদত্যাগপত্র সমর্পণ করেছিলেন এবং তিনি তা গ্রহণ করেছিলেন। তবে কয়েক মাস পর একটি সাক্ষাৎকারে তিনি স্বীকার করেন যে তার কাছে এই পদত্যাগের কোনো লিখিত প্রমাণ নেই এবং তিনি শুধু শুনেছেন যে হাসিনা পদত্যাগ করেছেন। এই পরস্পরবিরোধী বিবৃতি তখনকার আইন পরামর্শদাতা তার শপথ লঙ্ঘন হিসেবে অভিহিত করেন।

জুলাই গণ–অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর তাঁর ভূমিকা এবং শেখ হাসিনার পদত্যাগপত্র নিয়ে পরস্পরবিরোধী বক্তব্য নতুন করে তাঁকে বিতর্কের কেন্দ্রে নিয়ে আসে।

জুলাইয়ের বিদ্রোহ চলাকালীন সাহাবুদ্দিনের অবস্থান শীঘ্রই জনসমালোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতৃবৃন্দ এবং অন্যান্য সংগঠন তার বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলে যে তিনি সরকারের দমন ও নরহত্যার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেননি। তারা বঙ্গভবন অবরোধের চেষ্টা করে এবং তার অপসারণের জন্য একাধিক প্রতিবাদ সংগঠিত করে।

সাম্প্রতিক সময়ে তার নামে আরও গুরুতর প্রশ্ন সামনে আসে যখন খবর প্রকাশ পায় যে তিনি চিকিৎসার জন্য লন্ডনে থাকার সময় দিল্লিতে অবস্থিত শেখ হাসিনার সাথে টেলিফোন যোগাযোগ স্থাপন করেছিলেন। এই খবরটি রাজনৈতিক পরিবেশে নতুন তোলপাড় সৃষ্টি করে যদিও এর সত্যতা কখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ গঠনের পরে বিরোধী দলগুলি সংসদীয় অধিবেশনে তার বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ উপস্থাপন করে। সংবাদমাধ্যম ও আন্দোলনের নেতারা দাবি জানান যে তার পদত্যাগপত্র সংক্রান্ত বিবৃতিতে মিথ্যা রয়েছে, তার বিরুদ্ধে আর্থিক সংক্রান্ত অভিযোগ রয়েছে এবং জুলাইয়ের ঘটনাবলীর সময় তিনি নির্লিপ্ত ছিলেন। এনসিপির নেতৃত্ব তার অভিশংসন এবং আটক দাবি করেন।

অবশেষে, যে অপ্রত্যাশিত মনোনয়ন এবং আওয়ামী লীগের ঘনিষ্ঠতা নিয়ে সাহাবুদ্দিনের রাষ্ট্রপতি জীবন শুরু হয়েছিল, সেই একই বিতর্কই তার তিন বছর তিন মাসের মেয়াদকে পূর্বের চেয়ে আরো তীব্র আকারে চিহ্নিত করে। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে তার অতীত ভূমিকা, বাংকিং খাতে তার সংযোগ এবং বর্তমান রাজনৈতিক সংকটে তার অবস্থান, সবকিছু মিলে একটি অসমাধানীয় বিতর্কের তৈরি করে যা তার পদত্যাগের দিকে পরিচালিত করে।

মন্তব্য (0)

মন্তব্য নীতি

এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনি করুন।