বৃহস্পতিবার, ১৩ আগস্ট ২০২৬

ভাইরাল ভিডিওর পর দল থেকে বের, সংসদ সদস্যপদ বাতিলের প্রশ্ন দেখা দিয়েছে

2 সপ্তাহ আগে | আপডেট: 5 দিন আগে | জাতীয়

Administrator

ভাইরাল ভিডিওর পর দল থেকে বের, সংসদ সদস্যপদ বাতিলের প্রশ্ন দেখা দিয়েছে

জামায়াতে ইসলামী ভাইরাল ভিডিওর পর সাতক্ষীরা-৪ এর এমপি গাজী নজরুলকে বহিষ্কার করেছে। তার সংসদ সদস্যপদ বাতিল হবে কিনা তা নিয়ে আইনি অনিশ্চয়তা রয়েছে।

সর্বশেষ সব খবরের জন্য দৈনিক খবর সংযোগের গুগল নিউজ চ্যানেল অনুসরণ করুন।

সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী মো. নজরুল ইসলাম জামায়াতে ইসলামী থেকে চিরকালের জন্য পদচ্যুত হয়েছেন। একটি ব্যক্তিগত ভিডিও ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়ার পরে দলটি তার বিরুদ্ধে তদন্ত পরিচালনা করে নৈতিক অনিয়মের প্রমাণ পায় এবং এই সিদ্ধান্তে পৌঁছায়। এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে উঠেছে তার সংসদ আসনটি বৈধ থাকবে কিনা।

১৯৭২ সালের গণপ্রতিনিধি আদেশের ১২(খ) বিধান অনুসারে কোনো ব্যক্তি পার্লামেন্ট সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হতে বা থাকতে হলে তাকে অবশ্যই কোনো নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল দ্বারা মনোনয়িত হতে হবে অথবা স্বাধীন প্রার্থী হিসেবে দাঁড়াতে হবে।

গত সপ্তাহের সোমবার রাতে ৭৫ বছর বয়সী গাজী নজরুলের একটি ভিডিও অনলাইন প্ল্যাটফর্মে প্রচার হয়। এর ফলে সামাজিক মাধ্যমে বিস্তৃত প্রতিক্রিয়া শুরু হয়। তিনি দাবি করেন যে তরুণীটি তার দ্বিতীয় পত্নী, যার নাম মরিয়াম বেগম। দাবি অনুযায়ী ১৭ জুন তাদের বিবাহ অনুষ্ঠিত হয়েছিল। এই দাবি তার প্রথম স্ত্রী মাকসুদা ইসলাম, নবদম্পতির বাবা মাসুম বিল্লাহ এবং বিবাহের সাক্ষীরাও সমর্থন করেন। বিয়ের বিষয়টি আগে প্রকাশ্যে ঘোষণা করা হয়নি বলেই এত সমালোচনা হয়েছে।

বুধবার দলটি অভ্যন্তরীণ তদন্তের মাধ্যমে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছায়। বিরোধী দলের নেতার বাসস্থানে জামায়াতের নির্বাহী সংস্থা মিলিত হয় এবং দলের আমির শফিকুর রহমান এই অধিবেশন পরিচালনা করেন। তদন্ত প্রক্রিয়ায় গাজী নজরুল তার বিবাহের সত্যতা প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছিলেন, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদী গোপনীয়তা বজায় রাখার যুক্তিসঙ্গত ব্যাখ্যা প্রদান করতে পারেননি। গাজী নজরুলের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা সফল হয়নি কারণ বৃহস্পতিবার থেকে তার মোবাইল যোগাযোগযোগ্য নয়।

তিন মেয়াদের সংসদ প্রতিনিধি গাজী নজরুল জামায়াতের সর্বোচ্চ পরামর্শদাতা সংস্থা অর্থাৎ কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরার সদস্য ছিলেন। দলের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি অনুযায়ী, তাকে সংগঠনের নিয়মিত সদস্যপদ সহ সমস্ত অবস্থান থেকে স্থায়ীভাবে অপসারণ করা হয়েছে। এই সিদ্ধান্তের সংবাদ শুনে শ্যামনগর এবং আশাশুনি অঞ্চলের বিএনপি সমর্থকরা উদযাপন করেছে। এর আগে সংগঠনটি গাজী নজরুল সম্পর্কে গণবিরোধ প্রদর্শন করেছিল এবং তার বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপের দাবি জানিয়েছিল। এদিকে তার নিয়োগকৃত গাড়িচালক ওবায়দুল্লাহ তার বিরুদ্ধে হত্যার চেষ্টার অভিযোগ করে মামলা করেছেন।

নির্বাহী সংস্থা জামায়াতের সহায়ক সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদের মাধ্যমে জানায় যে তারা নির্বাচন প্রায়োগিক বিভাগের কাছে যোগাযোগ করবে যাতে গাজী নজরুলের পার্লামেন্টারি যোগ্যতা বাতিল করা যায়। তদন্তের সিদ্ধান্তে বলা হয়েছে যে গাজী নজরুল নৈতিক অবনতির কাজ করেছেন। ইসলামি শিক্ষা অনুযায়ী গোপনীয় বিবাহ সমর্থনযোগ্য নয়। ধর্মীয় নিয়ম মেনে চলার ক্ষেত্রে বিবাহ প্রকাশ্যে ঘোষণা করা এবং নিবন্ধিত করা অপরিহার্য।

জামায়াতের সংবিধান অনুচ্ছেদ ৬২(২খ)-তে বর্ণিত হয়েছে যে সংগঠনের কোনো সদস্য এমন কর্মকাণ্ড করলে যা জামায়াতের মূল্যবোধ ক্ষতিগ্রস্ত করে বা খ্যাতি নষ্ট করে, তাকে অপসারিত করা যায়। অনুচ্ছেদ ৬৩(৩) অনুসারে আঞ্চলিক সংস্থাসমূহ এই ধরনের সিদ্ধান্ত জানাবে এবং কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব তার পরামর্শদাতা পরিষদের সাথে পরামর্শ করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে পারে। এভাবেই এই পদক্ষেপ বাস্তবায়িত হয়েছে।

সংসদ সদস্যতা নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকার কারণ সংবিধান এবং আইনে স্পষ্ট নির্দেশনার অভাব। ১৯৮০ সালের সংসদ সদস্য আইনের ৩ ধারা বলে যে কোনো বিরোধ দেখা দিলে ৩০ দিনের মধ্যে স্পীকার তা নির্বাচন বিভাগের কাছে পাঠাবেন। তবে এই বিধান অনুচ্ছেদ ৭০-এর সাথে সম্পর্কিত যা দল পরিত্যাগ এবং দলের বিরুদ্ধে ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।

সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৭০ অনুসারে এমপি যদি দল ত্যাগ করে বা দলের নির্দেশনার বিরুদ্ধে ভোট দেয় তবে আসন খালি হয়ে যায়। অনুচ্ছেদ ৬৬ নির্ধারণ করে যে দুই বছরের বেশি কারাদণ্ড পেলে এমপি পদ বাতিল হবে এবং মুক্তির পাঁচ বছর পর আবার প্রার্থী হতে পারবেন। তবে গাজী নজরুলের ক্ষেত্রে এই দুটি বিধানই প্রযোজ্য নয়। তিনি নিজে থেকে পদ ছাড়েননি এবং কোনো আদালত দ্বারা দণ্ডিতও নন।

পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নতুন কারণ এর আগে কোনো স্পষ্ট রায় আসেনি যখন শুধুমাত্র দল কোনো এমপিকে বহিষ্কার করেছে। ১৯৯৮ সালে বিএনপির দুইজন এমপি হাসিবুর রহমান স্বপন এবং আলাউদ্দিন আহমদ শেখ হাসিনার মন্ত্রিসভায় যোগ দিয়েছিলেন। তাদের ক্ষেত্রে দলত্যাগের রায় দেওয়া হয়েছিল কিন্তু এটি আনুষ্ঠানিক দল পরিত্যাগ ছিল না। ২০০৪ সালে বিএনপির এমপি আবু হেনা দল থেকে বহিষ্কৃত হয়েছিলেন কিন্তু তার আসন বাতিল করা হয়নি কারণ তখন ২০০৮ সালের আইনি সংশোধন এখনো বলবৎ ছিল না।

২০১২ সালে একই আসনের এমপি এইচএম গোলাম রেজা জাতীয় পার্টি থেকে বহিষ্কৃত হয়েছিলেন কিন্তু সংসদ সদস্যপদ বজায় রেখেছিলেন কারণ তৎকালীন স্পীকার নির্বাচন কমিশনকে অবহিত করেননি। পরবর্তীতে ২০১৫ সালে আওয়ামী লীগ আবদুল লতিফ সিদ্দিকীর ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনের কাছে যায়, কিন্তু তিনি প্রাথমিক শুনানির অগ্রভাগেই পদত্যাগ করে দেন। এর ফলে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত রেকর্ডে নেই। সুপ্রিম কোর্টের বিশিষ্ট আইনজীবী ও জামায়াতের নির্বাহী পরিষদ সদস্য শিশির মনির মতে দল থেকে বহিষ্কার অর্থ সংসদ সদস্যপদ শেষ হয়ে যাওয়া।

২০২১ সালে সাবেক প্রতিমন্ত্রী মুরাদ হাসান জামালপুর জেলা আওয়ামী লীগ থেকে বহিষ্কৃত হয়েছিলেন কিন্তু তার সংসদীয় আসন বাতিল হয়নি। গাজী নজরুলকে পদত্যাগ করার জন্য চাপ দেওয়া হচ্ছে বলে জানা যায়। সংসদীয় দলের এমপিরা তাঁর পক্ষে নন। সবাই তাঁর বহিষ্কারের পক্ষে ছিল কারণ সংসদে বসলে বিএনপির আক্রমণ জামায়াতকে বিব্রত করত। তাঁকে আইনি লড়াই চালিয়ে গেলে হয়তো সংসদে কয়েক মাস বা বছর থাকতে পারতেন কিন্তু সরকারি সংসদীয় দলের সাথে আসন ভাগ করে নিতে পারতেন না।

নির্বাচন বিভাগের সচিব আখতার আহমেদ জানিয়েছেন যে তারা এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক চিঠি পাননি তবে চিঠি পেলে আইন অনুসারে পদক্ষেপ নেওয়া হবে। সংবিধানের ৬৬(৪) অনুচ্ছেদে বলা আছে যে অনুচ্ছেদ ৭০ সম্পর্কিত যে কোনো বিরোধ নির্বাচন বিভাগে পাঠানো হবে এবং সেখানকার সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হবে। তবে এটি কেবল ৭০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী পদত্যাগ বা দলের বিরুদ্ধে ভোটের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।

মন্তব্য (0)

মন্তব্য নীতি

এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনি করুন।