বইপড়া কি মানসিক সমস্যার সমাধান করতে পারে, বিশেষজ্ঞরা কী বলছেন
Administrator
বই পড়া মানসিক সুস্থতার একটি শক্তিশালী পরিপূরক হতে পারে, তবে সঠিক বইয়ের নির্বাচন এবং পেশাদার নির্দেশনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মেডিকেল বিশেষজ্ঞরা মনে করেন।
বই পড়ার মাধ্যমে মানসিক স্বাস্থ্য সেবা পাওয়ার ধারণা আধুনিক যুগে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে। 'বিবলিওথেরাপি' নামক এই পদ্ধতিতে ব্যক্তির মানসিক অবস্থা এবং চাহিদা বিবেচনা করে নির্দিষ্ট বই নির্ধারণ করা হয়। মানসিক চাপ, বিষণ্নতা অথবা জীবনের দুঃসময় সামলাতে ওষুধ এবং পেশাদার পরামর্শের সাথে এই পদ্ধতিও ক্রমবর্ধমান সংখ্যক মানুষের আস্থার বিষয় হয়ে উঠছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন উপযুক্ত নির্বাচনের মাধ্যমে বইগুলো মানসিক সুস্থতায় সহায়ক হতে পারে, তবে এটি কোনো চিকিৎসার প্রতিস্থাপন নয়।
যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসকারী একজন শিক্ষক ও গ্রন্থাগারকর্মী এলিজাবেথ রাসেল নিজের কঠিন অভিজ্ঞতার মাধ্যমে এই পদ্ধতির কার্যকারিতা আবিষ্কার করেছেন। কানেকটিকাট অঞ্চলে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তার কর্মস্থল রয়েছে। ২০১৭ সালে তিনি ব্যক্তিগত জীবনে অভূতপূর্ব সংকটের মুখোমুখি হন - দীর্ঘমেয়াদী বিষণ্নতা, বৈবাহিক বিচ্ছেদ এবং দুটি সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর উদ্বেগ তার মানসিক অবস্থাকে বিপর্যস্ত করেছিল। এই পরিস্থিতিতে 'ক্রিয়েটিভ বিবলিওথেরাপি' সম্পর্কে জানতে পেরে তিনি এই পথে এগিয়ে যান।
যুক্তরাজ্যের একজন অভিজ্ঞ বিবলিওথেরাপিস্ট এলা বার্থউড তার জটিল মানসিক অবস্থার প্রেক্ষাপটে কয়েকটি উপন্যাস পড়ার পরামর্শ প্রদান করেন। এই উপন্যাসগুলোর চরিত্র এবং তাদের জীবনসংগ্রাম রাসেলকে নিজের সংকট বুঝতে, একাকিত্বের অনুভূতি থেকে মুক্তি পেতে এবং মানসিকভাবে পুনরুজ্জীবিত হতে সহায়তা করেছিল। এই যাত্রা তার অভ্যন্তরীণ জগতে একটি নতুন সচেতনতা এবং শক্তির সঞ্চয় ঘটিয়েছে।
বর্তমানে ব্রিটেন এবং বিশ্বজুড়ে এই চিকিৎসা পদ্ধতির প্রচলন দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। শুধুমাত্র কাল্পনিক সাহিত্য নয়, ব্যক্তিগত উন্নয়ন সংক্রান্ত এবং তথ্যভিত্তিক প্রকাশনাও এই প্রক্রিয়ায় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। নির্দিষ্ট মানসিক বিষয়ে সুস্থতা বৃদ্ধি, গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়তা, এবং বিভিন্ন মানসিক সমস্যার পরিচর্যায় পেশাদারেরা বই ব্যবহার করার পরামর্শ দিচ্ছেন।
গবেষণা থেকে জানা গেছে, এই পদ্ধতির সুফল সবসময় নিশ্চিত নয়। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন গবেষক এমিলি ট্রোসিয়াঙ্কো খাদ্য সম্পর্কিত মানসিক রোগ (ইটিং ডিসঅর্ডার) নিয়ে গবেষণা করেছেন। তার অনুসন্ধানে দেখা যায় যে এই রোগে আক্রান্ত অনেক পাঠক এই বিষয়ের উপর ভিত্তি করে লেখা উপন্যাস পড়ার পর বরং আরও গভীর মানসিক চাপ অনুভব করেছেন এবং তাদের লক্ষণ আরও প্রকট হয়েছে।
সতর্কতা এবং দায়িত্বশীলতা এখানে অত্যন্ত জরুরি। যেকোনো নেতিবাচক অভিজ্ঞতা যা সাহিত্যে আকর্ষণীয়ভাবে উপস্থাপন করা হয় তা পাঠকের জন্য ক্ষতিকর প্রমাণিত হতে পারে। এই কারণেই মানসিক স্বাস্থ্য সংক্রান্ত পাঠ্যসামগ্রী নির্বাচনে অত্যন্ত সাবধানতা অপরিহার্য বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন।
এনএইচএস-এর একজন চিকিৎসক অ্যান্ড্রু শুম্যান স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে বিবলিওথেরাপি প্রধান চিকিৎসার পরিবর্তন করতে পারে না, বরং এটি অন্যান্য চিকিৎসার সহায়ক হিসেবে কাজ করতে পারে। যারা গুরুতর মানসিক রোগে ভুগছেন বা আত্মহত্যার ঝুঁকিতে আছেন তাদের জন্য শুধুমাত্র বইয়ের উপর নির্ভর করা অনুচিত এবং অপর্যাপ্ত।
যুক্তরাজ্যের একটি অলাভজনক সংস্থা দ্য রিডিং এজেন্সি ২০১৩ সাল থেকে 'রিডিং ওয়েল' শীর্ষক একটি উদ্যোগ বাস্তবায়ন করছে। বিষণ্নতা, স্মৃতিভ্রংশতা এবং অন্যান্য মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার সম্মুখীন ব্যক্তিদের জন্য বিশেষজ্ঞদের নির্দেশনায় সতর্কতার সাথে নির্বাচিত বইয়ের তালিকা প্রস্তুত করা হচ্ছে। এই উদ্যোগের অধীনে এ পর্যন্ত ৩৯ লাখেরও বেশি প্রকাশনা ধার দেওয়া হয়েছে।
২০২২ সালে সংস্থাটি যে সমীক্ষা পরিচালনা করেছিল তাতে অংশগ্রহণকারী ৮১ শতাংশ মানুষ জানিয়েছেন যে এই কর্মসূচির বইগুলো তাদের নিজস্ব মানসিক অবস্থা সম্পর্কে গভীর অন্তর্দৃষ্টি অর্জনে সহায়ক হয়েছে।
গবেষণায় এটিও স্পষ্ট হয়েছে যে শুধুমাত্র বই পড়া যথেষ্ট নয়; পাঠক এবং পাঠ্যবস্তুর মধ্যে একটি মানবিক সংযোগ অপরিহার্য। পাঠক যখন বইয়ের চরিত্র, পরিস্থিতি বা অভিজ্ঞতার সাথে নিজেকে চিহ্নিত করতে পারেন এবং সংযুক্ত অনুভব করেন তখনই মানসিক কল্যাণে প্রকৃত ইতিবাচক পরিবর্তন পরিলক্ষিত হয়।
একইসাথে, অনেক গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে যে বই পড়ার অভিজ্ঞতা অন্যদের সাথে ভাগ করে নেওয়া এবং আলোচনা করা এর উপকারী ফলাফলকে আরও শক্তিশালী করে। এই কারণে বিশেষজ্ঞরা বই পাঠচক্র বা সাহিত্য আলোচনা দল গঠনে অংশগ্রহণের সুপারিশ করেন।
তবে মনে রাখতে হবে, একই বই সকলের জন্য সমানভাবে কার্যকর নাও হতে পারে। কেউ যদি উপকার অনুভব করেন তবে এটি চালিয়ে যেতে পারেন, আর কারও যদি কোনো অস্বস্তি বা নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া হয় তবে থেমে দেওয়া সম্পূর্ণ স্বাভাবিক এবং প্রয়োজনীয়। যথাযথ পেশাদার পরামর্শ নিয়ে চিকিৎসকের নির্দেশনায় বইকে মানসিক যত্নের একটি পরিপূরক হাতিয়ার হিসেবে প্রয়োগ করা যেতে পারে।
মন্তব্য (0)
মন্তব্য নীতিএখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনি করুন।