বৃহস্পতিবার, ১৩ আগস্ট ২০২৬

জাহাঙ্গীরনগরের শিক্ষার্থী ও পরিবার ঝুঁকিতে, ভর্তি তথ্য ব্যবহার করে চলছে সংগঠিত প্রতারণা

3 সপ্তাহ আগে | আপডেট: 1 সপ্তাহ আগে | জাতীয়

Administrator

জাহাঙ্গীরনগরের শিক্ষার্থী ও পরিবার ঝুঁকিতে, ভর্তি তথ্য ব্যবহার করে চলছে সংগঠিত প্রতারণা

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের পরিবারকে লক্ষ্য করে একটি সংগঠিত প্রতারণা চক্র সক্রিয়। গত ছয় মাসে কমপক্ষে ৬৬ জন শিক্ষার্থীর পরিবার প্রতারণার শিকার হয়েছে, প্রতারকরা ভর্তির সময় দেওয়া ব্যক্তিগত তথ্য কাজে লাগাচ্ছে।

সর্বশেষ সব খবরের জন্য দৈনিক খবর সংযোগের গুগল নিউজ চ্যানেল অনুসরণ করুন।

দিনাজপুরের বিরল উপজেলা থেকে শুরু করে রাজধানী—সর্বত্র এখন একটি সংগঠিত প্রতারণা চক্রের আওয়াতায় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও তাঁদের পরিবার। ১৯ জুলাই রাত সাড়ে নয়টায় আমজাদ আলীর ফোনে এক অজানা নম্বর থেকে আসে ডিবি পরিচয়ে একটি কল। বক্তা দাবি করে আমজাদের ছেলেকে মাদকের সাথে ধরা পড়েছে। টাকা পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয় বিকাশে।

কান্নার শব্দ ফোনে শোনানো হয়। প্রতারক বলে এটি ছেলের কণ্ঠ। ভয় ও দ্রুত সিদ্ধান্তের চাপে আমজাদ বাজারে টাকা পাঠানোর ব্যবস্থা করতে যায়। এমন সময়ে পরিবারের অন্যরা সরাসরি তাঁর ছেলে শাকিল হোসেনকে ফোন করে জানতে পারে সে নিরাপদে বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলে রয়েছে। শাকিল রসায়ন বিভাগের ৪৮তম ব্যাচের স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থী।

একই ঘটনা পুনরাবৃত্তি হয় মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের ৫৫তম ব্যাচ থেকে এসেছেন এমন প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী তাসনিম আলমের বাবার সাথে। তাসনিম জানান যে প্রতারক তাঁর ব্যক্তিগত তথ্য এত নিখুঁতভাবে বর্ণনা করেছিল যে তাঁর বাবা প্রাথমিকভাবে অত্যন্ত ভীত হয়ে পড়েন। তবে পেশাদার শিক্ষক হওয়ার সুবাদে বাবা সতর্কতা বজায় রেখে কোনো অর্থ হস্তান্তর করেননি।

এই ধরনের অভিযোগ শুধু দুটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের দুটি ফেসবুক গ্রুপে গত ছয় মাসের মধ্যে কমপক্ষে ৬৬ জন শিক্ষার্থী এই ধরনের প্রতারণার অভিজ্ঞতা শেয়ার করেছেন। সবচেয়ে সাম্প্রতিক অভিযোগ গত মঙ্গলবারের, যেখানে আরেকজন শিক্ষার্থী তাঁর নিজের পরিবারের সাথে ঘটা একই ঘটনার কথা জানিয়েছেন।

এই প্রতারণা চক্র বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করছে। কখনো নিজেদের ডিবি বা অন্য কোনো সাশ্রয়ী বাহিনীর কর্মচারী হিসেবে প্রতিনিধিত্ব করে ছেলেকে আটক দেখানো হয়, আবার কখনো বৃত্তির অর্থ প্রাপ্তিতে প্রযুক্তিগত সমস্যার অছিলায় অর্থ চেয়ে বসে। মূল উদ্দেশ্য একটাই—প্রতিটি পরিবারকে ঠকিয়ে অর্থ সংগ্রহ করা।

প্রতারণার বিষয়ে আমজাদ আলীর সাথে একই ধরনের অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হয়েছেন চারুকলা বিভাগের ৪৮তম ব্যাচের স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থী আকিবা মোস্তফার পরিবার। দুই পর্যায়ে ৩৬ হাজার টাকা হারানোর দুর্ঘটনা ঘটে তাঁদের। আকিবা বর্ণনা করেন কীভাবে অপরাধী তাঁর মায়ের কাছে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক পরিচয় দিয়ে উপবৃত্তির অর্থ ব্যাংক হিসাবে জমা দিতে সমস্যা দেখছে বলে একটি ভিন্ন অ্যাকাউন্ট নম্বর দাবি করেছিল। সেই অ্যাকাউন্টের তথ্য ও ওটিপি প্রদান করার মাধ্যমে তারা গণ্ধ ছাড়াই অ্যাকাউন্ট থেকে অর্থ উত্তোলন করে ফেলে।

সাজিয়া আফরিন যিনি আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের ৫৪তম ব্যাচের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী, তাঁর পরিবারও ১০ হাজার টাকা হারায়। সাজিয়া বলেন, প্রতারক তার নাম, বিভাগ, বর্ষ—সবকিছু সঠিকভাবে জানতেন এবং নিজেকে জাবির প্রতিনিধি হিসেবে পরিচয় দেন। এই তথ্যের যথার্থতা দেখে তাঁর বাবা সম্পূর্ণভাবে বিশ্বাসী হয়ে যান। অতঃপর যখন মেধাবৃত্তিতে সমস্যার কথা বলা হয় এবং সমাধানে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ও ওটিপি প্রয়োজন বলা হয়, তখন অসতর্কে তারা ওটিপি প্রদান করে ফেল এবং তাৎক্ষণিকভাবে তাদের অ্যাকাউন্ট খালি হয়ে যায়।

সাংবাদিকতা এবং মিডিয়া অধ্যয়ন বিভাগের শিক্ষার্থী তাসফিয়া আফনান অন্য ধরনের ফাঁদে পড়েন। তাঁর নথিতে নিবন্ধিত তাঁর বড় বোনের মুঠোফোন নম্বরে প্রথমে কল আসে। তাসফিয়া স্বয়ং সেই নম্বরে যোগাযোগ করলে বক্তা 'রেজিস্ট্রার ভবনের ২০৮ নম্বর কক্ষ' থেকে কথা বলছেন বলে দাবি করে এবং সরকার পরিবর্তনের কারণে উপবৃত্তিতে বিলম্ব হওয়ার কথা জানায়। ক্রেডিট কার্ডের ছবির অনুরোধ করা হয়। পরে তাসফিয়া যখন সরেজমিন তদন্ত করেন, তখন পরিষ্কার হয় রেজিস্ট্রার ভবনে কখনো ২০৮ নম্বর নামের কোনো রুম ছিল না।

শিক্ষার্থীদের সাথে আলাপকালে এমন ১০ জন ভুক্তভোগীর সাক্ষাত্কার নেন প্রথম আলো। সকলেই জানান যে প্রতারকরা যে সমস্ত ব্যক্তিগত বিবরণ তুলে ধরেছিল তা অনুরূপভাবে তাঁদের ভর্তির সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা বিভাগে জমা দেওয়া তথ্যের সাথে খাপ খায়। এই মিল দেখে তাঁরা মনে করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগ থেকে তথ্য ফাঁস হচ্ছে। উপবৃত্তি সংক্রান্ত সব তথ্য রয়েছে উচ্চশিক্ষা ও বৃত্তি বিভাগে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মোহাম্মদ কামরুল আহসান প্রথম আলোকে বলেন, এই অনিষ্ট সম্পর্কে শিক্ষা বিভাগকে অবগত করা হয়েছে এবং তারা ইতিমধ্যে একটি পর্যবেক্ষণ প্রেরণ করেছে। তিনি রেজিস্ট্রারকে একটি সচেতনতামূলক ঘোষণা জারি করার নির্দেশনা দিয়েছেন যাতে শিক্ষার্থীরা এই ধরনের প্রতারণা থেকে সতর্ক থাকতে পারে। তিনি যোগ করেন, 'যেসব নম্বর থেকে প্রতারণা করা হচ্ছে, সে নম্বরগুলো শিক্ষা শাখায় দিলে আমরা আইনি সহায়তা দেব।'

শিক্ষা বিভাগের ডেপুটি রেজিস্ট্রার সৈয়দ মোহাম্মদ আলী রেজা জানান যে যেসব টেলিফোন নম্বর থেকে এই অনিষ্টগুলি সংঘটিত হচ্ছে সেগুলি সংগ্রহ এবং তদন্তের জন্য রেজিস্ট্রারের সাথে আলোচনা চলছে যাতে পুলিশের সহযোগিতায় এই প্রতারক দলটি শনাক্ত করা সম্ভব হয়।

ভুক্তভোগীদের দাবি অনুযায়ী, প্রতারকদের দ্বারা ব্যবহৃত ডেটা শুধুমাত্র শিক্ষা বিভাগ থেকেই নয়, বরং সম্পূর্ণ তথ্য সিস্টেম থেকেই সংগৃহীত হয়েছে বলে মনে করা হয়। বৃত্তি প্রোগ্রামের বিবরণ, যেমন কে বৃত্তিপ্রাপ্ত তা ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হয়, তবে যে সমস্ত বিস্তারিত ফোনে ব্যবহার করা হয়েছে সেগুলি প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ নথি থেকে এসেছে বলেই মনে হয়।

উচ্চশিক্ষা ও বৃত্তি বিভাগের ডেপুটি রেজিস্ট্রার লুৎফর রহমান সরাসরি অভিযোগ অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, 'আমাদের অফিস থেকে এমন কিছু সম্ভব নয়। কে বৃত্তি পেয়েছে এই তথ্য ওয়েবসাইটে পাওয়া যায়, কিন্তু ফোন নম্বর প্রকাশিত হয় না। আমিও কয়েক দিন আগে এই চক্রের কাছ থেকে ফোন পেয়েছি। সমাধান শুধুমাত্র সচেতনতা, কারণ এই দল সবাইকেই কল দিচ্ছে।'

মন্তব্য (0)

মন্তব্য নীতি

এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনি করুন।