শনিবার, ১৫ আগস্ট ২০২৬

এলপিজির দীর্ঘমেয়াদী সরবরাহ নিশ্চিত করতে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বাংলাদেশের নতুন উদ্যোগ

2 সপ্তাহ আগে | আপডেট: 1 সপ্তাহ আগে | জাতীয়

Administrator

এলপিজির দীর্ঘমেয়াদী সরবরাহ নিশ্চিত করতে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বাংলাদেশের নতুন উদ্যোগ

বাংলাদেশ বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সংকটের প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্র থেকে দীর্ঘমেয়াদী এলপিজি সরবরাহ নিশ্চিত করার জন্য সক্রিয় পদক্ষেপ নিয়েছে এবং আমেরিকার উন্নয়ন অর্থায়ন প্রতিষ্ঠান থেকে তহবিল সংগ্রহের চেষ্টা করছে।

সর্বশেষ সব খবরের জন্য দৈনিক খবর সংযোগের গুগল নিউজ চ্যানেল অনুসরণ করুন।

বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে দীর্ঘমেয়াদে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস বা এলপিজি আমদানি করবে। বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা সংকটের মুখে থাকায় এই পদক্ষেপ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এলপিজি আমদানি এবং সংশ্লিষ্ট অবকাঠামো নির্মাণের জন্য মার্কিন আন্তর্জাতিক উন্নয়ন অর্থায়ন সংস্থা (ডিএফসি) থেকে তহবিল সংগ্রহের জন্য সরকার কাজ করছে। এই তথ্য অর্থ ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সূত্র থেকে জানা গেছে।

গত ফেব্রুয়ারিতে অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা ত্যাগের আগে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্র একটি পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছিল। এই চুক্তির প্রধান লক্ষ্য ছিল দুটি দেশের মধ্যে বাণিজ্য ঘাটতি হ্রাস করা। আগামী ১৫ বছরে যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রায় ১৫ বিলিয়ন ডলার মূল্যের এলএনজি এবং অন্যান্য জ্বালানি পণ্য আমদানির প্রতিশ্রুতি রয়েছে এই চুক্তিতে। এই চুক্তির ধারাবাহিকতায় ঢাকা এখন দীর্ঘমেয়াদী এলপিজি আমদানির পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে।

জুন ২৯ তারিখে ওয়াশিংটন ডিসিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপক্ষীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছিল। এতে বাংলাদেশ দূতাবাসের অর্থনৈতিক বিষয়ক মন্ত্রী ডা. মো. ফজলে রাব্বী এবং মার্কিন বিদেশ দপ্তরের শীর্ষস্থানীয় অর্থনৈতিক পরামর্শদাতা লরা অ্যান্ডারসন উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকের ফলাফল এবং সুপারিশগুলি সরকারের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের সচিবের কাছে প্রেরণ করা হয়েছে।

বৈঠকে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক মন্ত্রী যুক্তরাষ্ট্রের দুটি ক্ষেত্রে সমর্থন চেয়েছেন - দীর্ঘমেয়াদে এলপিজি আমদানিতে সহায়তা এবং ডিএফসি অর্থায়নের জন্য বাংলাদেশের যোগ্যতা প্রমাণে সমর্থন। তিনি উল্লেখ করেন যে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ ইতিমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের দশটি শীর্ষ এলপিজি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানকে আগ্রহপত্র জমা দিতে আমন্ত্রণ জানিয়েছে। এই কোম্পানিগুলিকে অংশগ্রহণে উৎসাহিত করতে মার্কিন সরকারের সক্রিয় ভূমিকার প্রয়োজন বলে মনে করা হয়েছে।

লরা অ্যান্ডারসন বাংলাদেশের প্রস্তাবে ইতিবাচক সাড়া দিয়ে জানান যে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর, জ্বালানি বিভাগ এবং বাণিজ্য বিভাগ সমন্বিতভাবে এই বিষয়ে কাজ করছে। এলপিজি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলির সাথে শীঘ্রই যোগাযোগ করা হবে তাদের অংশগ্রহণ সহজ করার জন্য, তিনি মন্তব্য করেন। বাংলাদেশ দূতাবাসকে যোগাযোগযোগ্য কোম্পানিগুলির তালিকা দ্রুত সরবরাহ করার অনুরোধ তিনি করেছেন।

মধ্যপ্রাচ্য থেকে সম্ভাব্য সরবরাহ সংকটের কারণে যুক্তরাষ্ট্রকে বিকল্প উৎস হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে বলে জ্বালানি বিভাগের কর্মকর্তারা জানান। চলমান ইরান সংঘাত, উৎপাদন ব্যাহত হওয়া এবং হরমুজ প্রণালির কৌশলগত অস্থিরতার কারণে বিশেষজ্ঞরা বিকল্প উৎসের গুরুত্ব বৃদ্ধি পেয়েছে বলে মত দিচ্ছেন। যুক্তরাষ্ট্র থেকে এলপিজি আমদানি বৃদ্ধি পেয়েছে বটে, তবে দীর্ঘ সমুদ্রপথে পরিবহন ব্যয় অনেক বেশি থেকে যায়।

মার্কিন আন্তর্জাতিক উন্নয়ন অর্থায়ন সংস্থা ২০১৯ সালে ছয় হাজার কোটি ডলার মূলধন নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল উন্নয়নশীল দেশগুলিতে গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ও কৌশলগত বিনিয়োগ বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে। অবকাঠামো, জ্বালানি এবং প্রযুক্তি খাতে ঋণ ও গ্যারান্টি সুবিধা প্রদান করে এই প্রতিষ্ঠান। বাংলাদেশ দীর্ঘকাল ধরে এই তহবিলের সুবিধা পেতে চেষ্টা করছে। শ্রম অধিকার, পরিবেশগত মান, ট্রেড ইউনিয়ন গঠনের অধিকার এবং সামগ্রিক কর্মপরিবেশ সংক্রান্ত যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগের কারণে বাংলাদেশ এখনও ডিএফসি অর্থায়নের যোগ্য হিসেবে স্বীকৃতি পায়নি।

তবে বৈঠকে লরা অ্যান্ডারসন অদূর ভবিষ্যতে বাংলাদেশ ডিএফসি অর্থায়নের যোগ্য হতে পারে এমন আশাবাদ ব্যক্ত করেন। সব দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় এই বিষয়টি ধারাবাহিকভাবে উত্থাপন করার প্রয়োজনীয়তা তিনি তুলে ধরেন। সম্ভাব্য মার্কিন বিনিয়োগকারীদের কাছে উপস্থাপনের জন্য অগ্রাধিকারভিত্তিক প্রকল্পের একটি বিস্তারিত তালিকা প্রস্তুত রাখার পরামর্শও তিনি দেন।

বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা মতামত প্রকাশ করেন যে ডিএফসি অর্থায়নের সুযোগ পেলে অবকাঠামো, জ্বালানি এবং শিল্প উন্নয়ন প্রকল্পগুলিতে দীর্ঘমেয়াদী বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণের ক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে।

বাংলাদেশে বার্ষিক প্রায় ১৫ লাখ টন এলপিজির প্রয়োজন হয়, যার মধ্যে প্রায় ৯৫ শতাংশ বিদেশ থেকে আমদানি করা প্রয়োজন। জ্বালানি সরবরাহে বৈশ্বিক যেকোনো বাধা দেশকে অত্যন্ত সংকটজনক পরিস্থিতিতে ফেলে দেওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ককে আরও কার্যকর করতে বৈঠকে খাতভিত্তিক ব্যবসায়ী প্রতিনিধি দল বিনিময়ের গুরুত্ব জোর দেওয়া হয়। মে মাসে ঢাকায় মার্কিন দূতাবাসের সহায়তায় সফলভাবে পরিচালিত একটি ব্যবসায়িক সফরের অভিজ্ঞতা বিবেচনা করে উভয় পক্ষ একমত হয় যে বৃহৎ প্রতিনিধি দলের পরিবর্তে খাতভিত্তিক ছোট দলের কার্যকারিতা বেশি। যৌথভাবে অগ্রাধিকার খাত চিহ্নিত করার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশের দুটি বৃহৎ জ্বালানি অবকাঠামো প্রকল্পে মার্কিন কোম্পানিগুলির আগ্রহ প্রকাশিত হয়েছে - ফ্লোটিং স্টোরেজ অ্যান্ড রিগ্যাসিফিকেশন ইউনিট (এফএসআরইউ) এবং ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডের দ্বিতীয় শোধনাগার (ইআরএল-২)। এই প্রকল্পগুলির দরপত্রে অংশগ্রহণের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলি আগ্রহ প্রকাশ করেছে। অর্থনৈতিক বিষয়ক মন্ত্রী উল্লেখ করেন যে এই বিষয়টি দ্রুত জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগকে জানানো হবে।

ওয়াশিংটন মিশন বৈঠকের সিদ্ধান্তগুলি বাস্তবায়নের জন্য সরকারকে পাঁচটি সুপারিশ উপস্থাপন করেছে। প্রথমত, যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য দশটি এলপিজি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের নাম মার্কিন সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগে পাঠাতে হবে। দ্বিতীয়ত, প্রতিটি দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় ডিএফসি অর্থায়নের যোগ্যতা বিষয়ে নিয়মিত উত্থাপন প্রয়োজন। তৃতীয়ত, সম্ভাব্য মার্কিন বিনিয়োগকারীদের সামনে উপস্থাপনের জন্য অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত প্রকল্পগুলির চূড়ান্ত তালিকা তৈরি করে রাখতে হবে। চতুর্থত, ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রে পাঠানো বাংলাদেশি ব্যবসায়ী প্রতিনিধি দলের জন্য যৌথভাবে অগ্রাধিকার খাত নির্ধারণ করতে হবে। পঞ্চমত, এফএসআরইউ এবং ইআরএল-২ প্রকল্পের দরপত্রের প্রক্রিয়া সম্পর্কে সঠিক সময়ে মার্কিন সরকারকে আনুষ্ঠানিকভাবে অবহিত করা অপরিহার্য।

মন্তব্য (0)

মন্তব্য নীতি

এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনি করুন।